ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৫ কার্তিক ১৪২৬

 
 
 
 

আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ

মহানায়কের মহাকাব্য ও বাঙালির মুক্তি

মাহতাব শফি ২:৪৫ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ০৭, ২০১৯

ফাইল ছবি

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এ অবিনাশী মহাকাব্য গাঁথেন ইতিহাসের মহানায়ক ও গণমানুষের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। এরপরই তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির প্রাণ। হয়ে উঠলেন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের জাতির পিতা।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা হয়ে উঠেছিল মিছিলের শহর। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষ পায়ে হেঁটে, বাস-লঞ্চে কিংবা ট্রেনে চেপে রেসকোর্স ময়দানে সমবেত হয়েছিলেন। সবার হাতে ছিল বাংলার মানচিত্র আঁকা লাল সূর্যের অসংখ্য পতাকা। বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর হাতাকাটা কালো কোট পরে বাঙালির প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু সেদিন দৃপ্তপায়ে উঠে আসেন রেসকোর্সের মঞ্চে। বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণের ১৮ দিন পর পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধনে নামলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। নয় মাসের সেই সশস্ত্র সংগ্রামের পর আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ঐতিহাসিক ভাষণকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড'-এর স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এই তালিকার মাধ্যমে ইউনেস্কো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে। ৪৮ বছর আগে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) স্বাধীনতাকামী ৭ কোটি মানুষকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

এই স্বীকৃতির মাধ্যমে বহুদূর এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। এটা শুধু বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি নয়, দেশের জন্যও এক বড় স্বীকৃতি। বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের নেতা ছিলেন না, তিনি বিশ্বের নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের নেতা। কিউবার প্রেসিডেন্ট বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।’

ভাষণে শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’

উত্তাল জনসমুদ্র যখন স্বাধীনতার ঘোষণা শুনতে উদগ্রীব, তখন বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো- এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন বলেন, ‘ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতির ফলে সারা বিশ্বের মানুষ এখন এটা জানবেন। ভবিষ্যতের পর ভবিষ্যত প্রজন্ম এটা জানবেন যে, বঙ্গবন্ধু ছিলেন এমন একজন মহামানব, তিনি কঠিন পরিস্থিতিতে এই ভাষণে ভারসাম্য রক্ষা করেছিলেন। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু না বলে জনগণকে শান্ত রাখতে পেরেছিলেন। বিশ্বে আর কোনো রাজনীতিবিদ এটা পেরেছেন বলে আমাদের জানা নেই। এই ভাষণ অনেক ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। এটা এখন নিজস্ব গতিতে সবার কাছে পৌঁছে যাবে। এখন এটা ওয়েবসাইটে সবগুলো অনুবাদ তুলে দিতে হবে।’

বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ একটি নিরস্ত্র জাতিকে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল। ১৮ মিনিটের ভাষণটি ছিল অলিখিত। তিনি সারাজীবন যা বিশ্বাস করতেন, সেই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই ওই ভাষণ দিয়েছিলেন।

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন, ‘ভায়েরা আমার, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন।'

সেদিন ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ব্যাপক কোনো প্রস্তুতি নিয়ে অভিও-ভিডিও করা যায়নি। যতটুকুও করা গেছে, ততটুকু সমন্বিতভাবে প্রচার বা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এর কারণ, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ঢাকা বেতার থেকে সরাসরি প্রচার হওয়ার কথা থাকলেও পাকিস্তান সরকারের হস্তক্ষেপে তা সেদিন প্রচারিত হতে পারেনি। এর চিত্রায়ণও বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। এ ধরণের ভাষণ ধারণ করার মতো প্রযুক্তিও তখন তেমন বিশেষ ছিল না। যা ছিল তা বেশ ভারি ও আয়তনসমৃদ্ধ ছিল। তা ছাড়া বঙ্গবন্ধু সেদিন কী বলবেন, তাও আগে থেকে নির্ধারিত বা ঘোষিত ছিল না। তবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবেন, দিক নির্দেশনা দেবেন-এমন আভাস ছিল, ধারণা ছিল। দেশি-বিদেশি মিডিয়াগুলো সভাস্থলে তাই আগ্রহ নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। তখন অবশ্য আজকের মতো ভিডিও ক্যামেরা তেমন ছিল না। ফটো সাংবাদিক এবং রিপোর্টাররা ছবি এবং সংবাদ সংগ্রহ করতেন। তেমন পরিস্থিতিতে কথা ছিল বাংলাদেশ বেতার বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি সরাসরি প্রচার করবে। তাদের সে ধরণের প্রস্তুতি ছিল। তবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এ এইচ এম সালাহউদ্দিন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আবুল খায়ের এমএনএ। তারা আগেই সিদ্ধান্ত নেন, যেভাবেই হোক ভাষণের রেকর্ডিং করতে হবে। একই সঙ্গে দৃঢ় ছিলেন সরকারের ফিল্ম ডিভিশনের (ডিএফপি) কর্মকর্তা (পরে অভিনয়শিল্পী হিসেবে খ্যাত) মরহুম আবুল খায়ের। তিনি সচল ক্যামেরা বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

বিশেষত ভাষণের পরিবেশ শুরু থেকে শেষ অবধি এতটাই আবেগ, উত্তেজনা ও দৃষ্টিকাড়া ছিল যে কোনো ক্যামেরাম্যানের পক্ষেই নড়াচড়া করার তেমন সুযোগ ছিল না। সে কারণে তিনি একটা দূরত্বে থেকে একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতার দৃশ্য যতটুকু পেয়েছেন ততটুকুই ধারণ করেছেন। ফলে দেখা যায় বক্তৃতার ভিডিও দৃশ্যটি ১০ মিনিটের। অন্যদিকে আবুল খায়ের এমএনএ'র তত্ত্বাবধানে মঞ্চের নিচে এ এইচ খন্দকার সম্পূর্ণ ভাষণের কথাই রেকর্ড করতে সক্ষম হলেন। বেতারের কর্মকর্তারাও ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করতে না পারলেও এটির পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড করাতে তারা সক্ষম হন, যা পরদিন বেতারকর্মী এবং জনগণের দাবির কারণে বেতার থেকে প্রচারিত হয়।

 

এমএস


oranjee