ঢাকা, রবিবার, ২৪ মার্চ ২০১৯ | ৯ চৈত্র ১৪২৫

 
 
 
 

গ্লোবাল টিভি অ্যাপস

বিষয় :

ঢাকা

  • সংসদে আমার এলাকার মানুষের দু:খ কষ্টের কথা বলবো: ফারুক
  • গানকে ভালবাসি বলেই সব কষ্ট ভুলে যাই: লিটন অধিকারী রিন্টু
  • ‘ক্লাসিকটা জানলে আধুনিক গানও গাওয়া যায়, পল্লিগীতিও গাওয়া যায়’
  • এবার হবে সাইবার যুদ্ধ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
  • বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হবে: মির্জা ফখরুল

নন্দিত ছড়াকার জগলুল হায়দারের সাক্ষাৎকার

অনুরূপ আইচ ২:৪৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯

নন্দিত ছড়াকার জগলুল হায়দার

বাংলাদেশের সমসাময়িক ছড়ায় জগলুল হায়দার একটি অনন্য নাম। শিশুতোষ ছড়া ছাড়াও ছড়ার প্রতিটি বিভাগে রয়েছে তার অবাধ বিচরণ। উত্তরাধুনিক ছড়ায়ও তিনি অত্যধিক জনপ্রিয়। জীবন্ত এ কিংবদন্তী কথা বলেছেন গ্লোবাল টিভির সাথে।

 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেনঃ অনুরূপ আইচ

দেশে এত সব পেশা থাকতে লেখালিখিতে এলেন কেন? এই প্রেম কি অনেক বড় হয়ে এসেছে জীবনে, নাকি শৈশব থেকেই অটুট রয়েছে?

আমার লেখালেখিতে আসার ব্যাপার নিয়া আগাম কুনো পরিকল্পনা ছিল না। মূলত ভিত্রে একধরণের ভাব ছিল। আমার বাবা অনেকটা স্বভাব কবি ছিলেন। মুখে মুখে ছড়া বানাইতেন। আবার কিছু কিছু ডাইরিতেও লেইখা রাখতেন। আব্বার সেই স্বভাবের আছর আমার উপ্রে পড়ছে। আবার আমার দাদা সূফীভাব প্রেমী মানুষ  ছিলেন; খানিকটা লৌকিক দার্শনিক কিসিমের।  সম্ভবত এইগুলার প্রভাব আমারে ভিতর থিকাই লেখালেখির জন্য প্রস্তুত করছে। এছাড়া বাবা বাহ্যিকভাবেও নানা কথা-আলাপে আমগো ভাইবোনদের অনুপ্রাণিত করতেন। যুদিও আব্বা চাইতেন আমি তার মতোই ইঞ্জিনিয়ার হই, আল্লাহর রহমতে আমি তা হইছিও তয় তার পাশাপাশি কেমনে কেমনে জানি লেখকও হয়ে উঠলাম।

একবারে ছোটবেলায়ই আসছে বরং বলা যায় জন্ম থিকাই আমার ভিত্রে ছিল এইটা। আর তার লিখিত প্রকাশ ঘটে ক্লাস সেভেনে থাকতে নাস্তার টেবিলে দেয়া বাবার একটা মোটিভেশনাল বক্তব্যের ফলেই।   

 

কবিতা, ছড়া, গদ্য, গান- সাহিত্যের কোন শাখায় আপনার বেশি টান?

ছন্দের প্রতি আমার একটা সহজাত ঝোঁক ছিল। অই যে আব্বার মুখে মুখে বানানো ছড়াগুলা শুনতাম। তো এইটা তো ছিলই। তারপরও লেখালেখির একদম গোঁড়ার দিকে কবিতার প্রতি ঝুঁইকা যাই। মূলত কবিতা পড়তে, শুনতে আর আবৃতি করতে আমার ভাল্লাগতো। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় যখন আমি পুরা দস্তুর লেখালেখি শুরু করলাম তখন তা আধুনিক গদ্য কবিতা দিয়াই শুরু করছিলাম। কিছুদিন (দুই/তিন বছর) এইভাবে লিখতে গিয়া একসময় গীতলতার ঘাটতি অনুভব করলাম হয় তো। আসলে অবচেতনে আমারে ছন্দ-তাল-লয়-অন্তমিল এইসব খুব টানতেছিল। ভিতর থিকা ছড়া আসতে শুরু করলো। দ্যাখা গেলো কবিতা লেখার নিয়তে ডাইরি নিয়া বসছি অথচ কবিতা না আইসা মন আর মগজে ছড়া আইসা ভর করতেছে। আর ভিতরের চাপে আমিও তা গড়গড় কইরা লেইখা ফেলতেছি। অতঃপর কবিতার মায়া ত্যাগ করতে হইল। পুরাপুরি ছড়াতেই মগ্ন হইলাম। সেই থিকা ছড়ায় আমার প্রথম টান। আমার লেখালেখিরে কয়েকটা ধাপে ভাগ করতে হয়। এর তৃতীয় ধাপে অর্থাৎ ১৯৯১ সালে বাবার মৃত্যুর পর যে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সেইটার সুচনা হইছিল গান দিয়া। আর ওইটা পূর্ণতা পাইছিল অনুকাব্য তথা পরবর্তীকালের বারোভাজা দিয়া। বাংলা কাব্যসাহিত্যের প্রধান তিনটা শাখা কবিতা, ছড়া ও গীতিকবিতা বা গান। এই তিনটার প্রতিই আমার একটা টান আছে যুদিও এর মধ্যে আমি আজ ছড়াতেই প্রবল। আর গদ্যের কথা বললে, সেইটা মোটেও উপেক্ষনীয় ছিল না আমার কাছে। বরং পড়ার ক্ষেত্রে যুদি বলি তাইলে আমার প্রবল ঝোঁক গদ্য পাঠেই। এমুনকি প্রবন্ধ, কলাম-বয়ান, গল্প, রম্য ও নাটক মিলায়া গদ্যও আমার একবারে কম নয়। গদ্যের প্রতি প্রেমও কম বলা যাইব না।   

 

দেশে এখন গান না জানা শিল্পী বা গানের গ্রামার না জানা গীতিকার-সুরকারের দৌরাত্ম্য চলছে বলা যায়। তাদের অনেকেই এখন খ্যাতির শিখরেও রয়েছে- ব্যাপারটা বাংলাদেশের গানের জন্যে কতটা মঙ্গলময় হচ্ছে?

খুব অনুভবি প্রশ্ন। এইটা আমগো গানের জন্য মঙ্গলময় তো নয়ই, কাঙ্ক্ষিতও নয়। যেকোনো শিল্প প্রকরণ তা হোক ছড়া, কবিতা, অভিনয় বা গান তাতে শিল্পীর একধরণের বুৎপত্তি থাকতে হয়। থাকতে হয় প্রস্তুতি। এইটা যে খালি বিদ্যায়তনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক হইতে হইব এমুন নয়, এইটা অন্তর্গতও হইতে হয়। অর্থাৎ শিল্পীকে তার চর্চিত শিল্প প্রকরণ সম্পর্কে যথার্থ ওয়াকেবহাল থাকতে হয়। তা থাকতে পারলে শিল্পটা মনের আনন্দে করা যায়। আর আনন্দ থিকা উৎপন্ন সেই শিল্প যেমুন উৎকৃষ্ট হয় তেমনি তা জনগ্রাহ্যও হয়। তো এইটা বুঝলে তা আমগো গানের জগতের জন্য যেমুন ভালো তেমনি ভালো সংশ্লিষ্ট শিল্পীর জন্যও।

 

তবে কেউ গান লেখার সঠিক নিয়ম না জানলেও যদি ভেতরে গান লেখার তাড়না অনুভব করে, তবে কি সে গান লিখবে না?

অবশ্যই লিখবো। আগের প্রশ্নের উত্তরেই সেই ইংগিত আছে। শিল্প জিনিসটাকে আমি প্রথমত প্রাকৃতিক মনে করি। অর্থাৎ এইটা অনেকটা গড গিফটেড বা খোদা প্রদত্ত। তো এখন কারো মধ্যে যুদি উপরওয়ালা এই গুণ দিয়া থাকেন তয় তিনি অবশ্যই তার চর্চা করবেন। ভালো একটা কথা মনে হইল ‘চর্চা’। এই চর্চাই আবার উচ্চমার্গে- সাধনা। এখন কেউ যুদি বুঝেন তার মধ্যে শিল্পের বিশেষ একটা ধারা খেলা করে। কিম্বা কুনো একটা ধারা তথা গান লেখায় তার নেক আছে তাইলে তিনি সেই বিষয়ে প্রাথমিক নিয়মকানুনগুলা জাইনা নিতে পারেন। এইটা যে খালি বই থিকা নিতে হইব এমুন না। কতোগুলা বিদ্যা আছে গুরুমুখি বিদ্যা। গান তো তার মধ্যেই পড়ে। যিনি গান লিখবেন একজন তরুণ গীতিকার একজন সিনিয়রের কাছ থিকা চাইলেই দরকারি টিপসগুলা নিতে পারেন। আসলে সিনিয়রের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা-সম্মান থাকলে আর নিজের কাজের প্রতি কমিন্টমেন্ট থাকলে এইগুলা জানা আজকাল অতো কঠিন কিছু না। সবাই না হইলেও অনেক সিনিয়র আছেন যারা শিখতে চাইলে শিখাইতে চায়। যেমুন আপনার কথাই জানি, আপনি তরুণ গীতিকারদের দরকারি পরামর্শ বা টিপস দেন। সবাই হয় তো সেইভাবে দেয় না বা দিতে পারে না তয় যারা দেন তাদের কাছে তো তরুণদের শিখার আগ্রহ প্রকাশ করতে হইব। আমিও ছড়ার ক্ষেত্রে এইটা যথাসম্ভব করি। কিন্তু আমি বা আপনি বা আর যারাই এই হেল্প করেন তারা কেউ তো কারো কাছে গিয়া তা দিমু না। সেই ক্ষেত্রে তরুণদেরই আগ্রহের সঙ্গে এইটা আদায় কইরা নিতে হইব। আর তা নিতে পারলে গান, ছড়া, কবিতা যাই বলেন কাজটা সে অনেক ভালভাবে করতে পারবো। আখেরে সেই লাভবান হইব। লাভবান হইব আমগো শিল্পের ভুবন।

 

গান লেখা নিয়ে আপনার জীবনে অনেক মজার ঘটনা আছে জানি, সে সম্পর্কে বলুন।

আমার গানের ব্যাপারটা দুইভাগে বিভক্ত। একটা গান লেখা আরেকটা গান রেকর্ড হওয়া। আমার ক্ষেত্রে লেখার ভাগটাই বেশি। আমি প্রচুর গান লিখছি। তয় যতোটা লিখছি ততোটা আবার রেকর্ড হয় নাই। তয় এই উভয় ক্ষেত্রেই কিছু মজার ঘটনা আছে। সব এখন মনেও নাই তয় একটা বলি- আমি বরাবর ঢাকায় চাকরি করলেও তখনো সপরিবারে ভৈরব থাকি। বন্ধের দিন ছাড়া প্রতিদিন ঢাকা-ভৈরব যাতায়াত করি। বাসে লম্বা জার্নিতে কিছু ঘুমাই আর কিছু গান লিখি। সম্ভবত ১৯৯৯ এর শেষে কিম্বা ২০০০ এর শুরুতে আমি ছোটভাইয়ের কাছ থিকা উপহার হিসাবে প্রথম মোবাইল সেট পাই। এমুনকি মোবাইল ব্যবহারের পরও আমার সাথে সবসময় ছোট প্যাড থাকতো। পথে গানের ভাব আসলে আমি সাথে সাথেই প্যাডে গানটা নামাইতাম। গানের কথায় একরকমের পাগলামি থাকে। তো সেই পাগলামি যখন আমি প্যাডে লেখি তখন পাশের যাত্রী কখনো হা কইরা আবার কখনো চুপিচুপি চায়া দেখতো। এতে আমি খানিক অস্বস্তি বোধ করতাম। আর এইটা এড়াইতে আমি রোমান হরফ তথা ইংরেজি অক্ষরে বাংলা গান লিখতাম। আমার ইংরেজি লেখা দেইখা পাশের যাত্রি সম্ভবত হতাশ হয়া আমার লেখার দিকে তাকাইতো না। তাতে বেশ সস্তি পাইতাম। আর আরামসে লিখতে পারতাম। এই অভ্যাসটা মোবাইল আসার পর আমার বেশ কাজে দেয় যখন মোবাইলে বাধ্য হয়া ইংরেজিতে লিখতে হইত; কারণ আমি তো এই কামে আগেই উস্তাদ। আমার বেশ কিছু গানের সুর করছেন সাদী মামা (উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুরকার শেখ সাদী খান)। মামা অনেক মজার মানুষ গান করতে গিয়া তার সন্নগেও অনেক মজার ঘটনা আছে। আর সুরকার আনোয়ার জাহান নান্টু ভাই আমার কিছু গজল নিয়া কাজ করছেন তার সংগেও বেশ মজার স্মৃতি আছে। আরেকটা ঘটনার কথা কই অই অর্থে হয় তো মজার ঘটনা নয় তয় আমার কাছে উল্লেখযোগ্য। সেইটা সম্ভবত ২০০২ সালের ঘটনা। তখনো আমি ভৈরব থিকা ঢাকায় অফিস করি। তো সেইসময় এক শুক্কুরবারে নামাজের প্রায় কাছাকাছি সময়। আমার মাথায় গুনগুন কইরা একটা নাত আসলো। আজান হইছে আগেই। আম্মা আর আমার স্ত্রী মসজিদে যাওয়ার জন্য রীতিমতো ধমক শুরু করছে। কিন্তু আমি আমার ছেলেকে সঙ্গে নিয়া সেই নাতের সুর ভাজতেছিলাম। শেষমেশ পুরা নাতটা নামাইতে নামাইতে জুম্মা পার। আমার স্ত্রী খুব রাগ করছিল অবশ্য নাতটা গায়া শুনানোর পর আম্মা আমার স্ত্রীকে বলছিল- বউ থাক আজ আর কিছু বইল না।

 

ঢাকা শহরে ব্যাস্ততার জন্যে অনেক লেখক মোবাইলের নোট প্যাডে কবিতা, ছড়া বা গান লিখে রাখেন। আপনার জীবনে এমন ঘটনা আছে কি?

অই তো আগেই বললাম। আমার জীবনে এইটা প্রায় রেগুলার ঘটছে। এইটা ছড়া, কবিতা, গান সবগুলার ক্ষেত্রেই ঘটছে। গানের ক্ষেত্রে বরং একটু বেশ ঘটছে, কারণ রাস্তায় জামে (জ্যামে) বইসা ভিতর থিকা গুনগুন কইরা গান আসত আমার, আর যখন আসত তখনই লেইখা রাখতে চেষ্টা করতাম, অন্তত মুখটা হইলেও। আবার ছড়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাটা আরো ভয়াবহ। একসময় প্রায় প্রতিদিন দৈনিকগুলাতে আমারে ছড়া লিখতে হইত। সেইসময় এমুনকি মাঝেমধ্যে একদিনে আমার ৫/৬টা ছড়াও ছাপা হইত বিভিন্ন দৈনিকে। আর দৈনিকের ছড়াগুলা সমকালীন বিষয়ে একবারে টাটকা প্রসঙ্গের উপ্রে লিখতে হইত। ফলে  একদম মেকাপের আগে আগে সম্পাদক হয় তো ফোন দিয়া বললেন; ভাই এই প্রসংগে একটা ছড়া দেন, মেকাপে বইসা আছি আপনার ছড়া পাইলেই ফাইনাল করুম। দ্যাখা গেলো তখন আমি বাসে লগে হয় তো আমার প্রিয় ছড়াকার ভাইব্রাদারদের কেউ আছে। অই অবস্থায় বাসে বইসাই নগদানগদ মোবাইলে রোমান হরফে ছড়া লেইখা পাঠাইছি। এমুন ঘটনা অনেকবার ঘটছে আর এইসময় কখনো কখনো পাশেই থাকতো অনুজ ছড়াকারদের কেউ কেউ।    

 

ফেব্রুয়ারির বইমেলায় আপনার নতুন বই কি কি পাবে পাঠকেরা?

এইবারের বইমেলায় আমার ৩টা নুতুন বই আসছে। এর একটা সমকালীন ছড়ার বই 'ইজিয়ানা বিজিয়ানা। বইটা প্রকাশ করছে প্রিয়বাংলা প্রকাশন। আমার বাছাই করা ছড়া নিয়া বাবুই থিকা প্রকাশ হইছে 'প্রিয় ৫০ ছড়া'। আর বারোভাজা সিরিজের ৬ষ্ঠ বই 'ইনসাফিয়াত' প্রকাশ হইছে অর্জন প্রকাশন থিকা।

 

চাকুরি ও লেখালিখি- কোনটায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

দুইটাতেই সাচ্ছন্দ বোধ করি। একটা প্রয়োজন আরেকটা ভালোবাসা। বিশ্বাসী মানুষ হিসাবে আমি জানি রিজিকের মালিক আল্লাহ। তয় আল্লাহ সেই রিজিক মানুষকে  অছিলার মাধ্যমে দেন। আমার ক্ষেত্রে চাকরি সেই অছিলা। শুধু তাই নয় প্রকৌশল পেশার এই চাকরি আমাকে যেমুন পরিবার নিয়া সম্মান ও ইজ্জতের সঙ্গে বাঁচার উপায় দিছে  তেমনি তা আমাকে লেখালেখির ক্ষেত্রে শুরু থিকাই নির্ভার রাখছে। ফলে দুইটার কুনোটার গুরুত্বই কম নয়। আর দুইটাকেই আমি সমান উপভোগ করি।

 

[সাক্ষাৎকারের উত্তরের ভাষারীতি লেখকের নিজস্ব যা তিনি চলতিভাষা রীতি হিসাবে চর্চা করেন]

 


oranjee