ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯ | ১৩ আষাঢ় ১৪২৬

 
 
 
 

একাত্তরে নারী, পাকিস্তানের বর্বরতা অতঃপর বাংলাদেশ

গ্লোবালটিভিবিডি ১:৫২ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮

মাহতাব শফি: উনিশ ’শ একাত্তর সালে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংঘটিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ত্রিশ লক্ষ শহীদ, দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি জাতির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। সেসময় রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী শুরু করেছিল গণহত্যা। আগ্রাসন, সংঘর্ষ এবং যুদ্ধের অনাকাক্সিক্ষত কিন্তু অনিবার্য শিকার হয়েছে নারীরা। যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যে নারী সশস্ত্র সমরে যুক্ত হয় কিংবা যে হয় না - উভয়ই পরিণত হয়েছে নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তুতে। নিরস্ত্র নারী পরিণত হয় সৈনিকের কামজ ক্ষুধা নিবারণের অনুষঙ্গে। সশস্ত্র নারীর ক্ষেত্রে এই নির্যাতন শুধু যৌনতার সীমায় আবদ্ধ থাকেনা, গোপন তথ্য আদায়ও তখন অন্যতম মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। তবে সংঘর্ষকালীন নারী নির্যাতনে যৌনতার ভূমিকা গৌণ হয়ে পড়ে।

“ঘরে ঢুকে দেখি, একি দৃশ্য। ও আল্লাহ, এমন দৃশ্য দেখার আগে কেনো আমার দুটি চোখ অন্ধ করলে না আল্লাহ। মেয়ের সামনে মাকে ধর্ষণ। কয়েকটি পাগলা কুত্তা আমার মাকে ও বড় বোনটিকে খাচ্ছে কামড়ে কামড়ে। এক পলক তাকানোর পর আর তাকাতেই পারছি না। তখন গায়ের জোরে একটা চিৎকার করলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত মুখ বেঁধে ঘরের এক কোনায় ফেলে রাখলো। তারপর ঠিক আমার পায়ের কাছে মাকে এনে শুইয়ে দিয়ে একেবারে উলঙ্গ করে ফেলে। তারপর আর বলতে পারছি না। এসব দৃশ্য আমাকে দেখতে হচ্ছে। আমি যখনই চোখ বন্ধ করে রাখতাম, তখনই তাদের হাতের ধারালো একটি অস্ত্র দিয়ে চোখের চারপাশে কেটে দিত। এভাবেই চলল মায়ের ওপর সারারাত নির্যাতন। আর কিশোর হয়ে আমাকে তা দেখতে হয়েছে। রাত ভোর হয় হয় - এমন সময় তারা চলে গেছে, মা ততক্ষণে মৃত। যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে গেল আমার অর্ধ মৃত রক্তাক্ত বোনটিকেও” -১৯৭১ এ পরিবারের সবাইকে হারানো শফিকুরের এমন আর্তি তাই বলে।

একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও সহযোগীরা এই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিত করে। মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই নয় মাসে ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনকে একটি শিল্পের পর্যায়ে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এই নির্যাতনের সংখ্যাগত মাত্রা সুবিশাল, এখন পর্যন্ত পাওয়া হিসেবে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা মোটামুটিভাবে সাড়ে চার লক্ষ এবং সংখ্যাটা আরো বেশি হবার সম্ভাবনা মোটেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ধর্ষিত নারীদের বড় একটি অংশকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে। কারো কারো মৃত্যু হয়েছে পৌনঃপুনিক ধর্ষণেই, একটি বুলেটেরও প্রয়োজন হয়নি সেজন্য।

সেদিন বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সামরিক কমান্ডার লে. জেনারেল নিয়াজি নিয়মিতভাবে উৎসাহিত করেছে তার অধীনস্থ সৈনিকদের - ‘গত রাতে তোমার অর্জন কী শের?’ অর্জন You cannot expect a man to live, fight and die in East Pakistan and go to Jhelum for sex, would you বলতে ক’জন নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে তাই বোঝাত নিয়াজি। নির্বিচার ধর্ষণের পক্ষে সাফাই গেয়েছে নিয়াজি -? তবে নিয়াজির কথামত একাত্তরে নারী নির্যাতন শুধু ‘সেক্স’ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত ধর্ষণের ক্ষেত্রে বয়সের বিচার করা হয়নি মোটেও, নারীদের ওপর চলেছে পর্যায়ক্রমিক নির্যাতন। সুজান ব্রাউনমিলার Against Our Will: Men, Women and Rape বইয়ে লিখেছেন, ‘Rape in Bangladesh had hardly been restricted to beauty,girls of eight and grandmothers of seventy-five had been sexually assaulted .Pakistani soldiers had not only violated Bengali women on the spot; they abducted tens of hundreds and held them by force in their military barracks for nightly use. Some women may have been raped as many as eighty times in a night.’

একাত্তরে নারীদের ওপর পাকিস্তানি নরপশুদের যৌন নির্যাতন কতটা ভয়াবহ, বীভৎস ছিল তা যুদ্ধ চলাকালে তেমন ভাবে প্রকাশিত হয় নি। ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর বাঙালী নারীর ওপর পাকিস্তানিদের নির্যাতন নিয়ে খুব কমই গবেষণা হয়েছে।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বি-জাতি ভিত্তিক পরিকল্পনায় ভারতবর্ষকে দুভাগ হয়ে পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান নামে দুটো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ভারতবর্ষের পূর্ব ও পশ্চিম এর দুটো অংশ নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব হয় প্রায় দেড় হাজার মাইলের মতো। স্বাধীন হয়েও পূর্ব পাকিস্তান ধীরে ধীরে পশ্চিমাংশের কলোনী হয়ে উঠল, এখানকার বাঙালিরা আগের মতোই রয়ে গেল। তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যেই আঘাত এল বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় পাকিস্তানের জনক ও গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করলেন ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। বাঙালিরা বুঝে নিল পাকিস্তান সৃষ্টির সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটেনি। শুরু হলো ভাষা আন্দোলন। এল অমর ২১ ফেব্রুয়ারি। ছাত্রজনতার মিছিল আর সেøাগানে মুখর হয়ে উঠে রাজপথ। শুরু হয় দেশব্যাপী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচন হলো। এল ৯২-ক ধারা, ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচিত হলো। সেইসঙ্গে শুরু হলো স্বায়ত্বশাসনের দাবি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করলেন। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমানের কুখ্যাত শিক্ষাকমিশন রিপোর্টকে ঘিরে শিক্ষানীতি বিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলো। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান শুরু করলেন তার ঐতিহাসিক ছ’দফা আন্দোলন। প্রবল এই বিক্ষোভের মুখে সংগ্রামী জনতার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলো আইয়ুব সরকার। রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতা থেকে নেমে যান ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। আর সঙ্গে সঙ্গে তার জায়গা নেন আরেক জান্তা ইয়াহিয়া খান। ক্ষমতায় এসেই সামরিক শাসন জারি করেন তিনি। জাতির প্রতি দেওয়া ভাষণে ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন ও জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দান করেন।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর রাতে পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর এক প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও সর্বনাশা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে দশ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়। সেই সঙ্গে গৃহহীন হয় আরো ত্রিশ লাখ। এ ভয়াবহ দুর্যোগে কেন্দ্রীয় সরকার রইল সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকায়। ১৯৭০ সালে চরম চাপের মুখে ইয়াহিয়া খান সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পায়, যা সমগ্র পাকিস্তানের সর্বমোট ৩০০ আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। তৎকালীন সামরিক সরকার এই ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। সোজা হিসেবে এই প্রথম পাকিস্তান শাসন করবে পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ। পাকিস্তানের সামরিক সরকার তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, কোনভাবেই বাঙালিদের নিকট পাকিস্তানের শাসনভার তুলে দেওয়া যাবে না। ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র চলতে থাকলেও ইয়াহিয়া খান সেটি বাইরে বোঝাতে চাইল না। তাই তিনি ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করলেন ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হবে। কিন্তু ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেয়। এরফলে সারাদেশে বিক্ষোভের যে বিস্ফোরণ ঘটল তার কোন তুলনা নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ঢাকা ও সারাদেশে ৫ দিনের জন্য হরতাল ও অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। ৫ দিনের হরতালের পর ৭ মার্চ ’৭১ সকালে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার বাসভবনে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সাক্ষাত করেন। এ বৈঠকে রাষ্ট্রদূত তার সরকারের সিদ্ধান্তের কথা শেখ মুজিবকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন, তা হলো- ’পূর্ব বাংলার স্বঘোষিত স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্র কখনোই সমর্থন করবে না। এদিকে ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিকেল প্রায় সাড়ে চারটায় বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক বক্তৃতায় চার দফা দাবির কথা উত্থাপন করেন- ১. সামরিক আইন প্রত্যাহার। ২. সেনাবাহিনীর ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন। ৩. নিহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ। ৪. প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। 

৭ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান জানালেন। এই মর্মে ১০ দফা কর্মসূিচ প্রকাশিত হয়। এইরকম উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ৯ মার্চ ’৭১ ঢাকার পল্টনের জনসভায় মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের লক্ষ্যে প্রদেশব্যাপী সংগ্রামের আহ্বান জানালেন।

১৫ মার্চ ’৭১ জুলফিকার আলী ভুট্টো এক সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ‘পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যা গুরু। তাই কেন্দ্রে ক্ষমতা পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের কাছে আর পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টির কাছেই হস্তান্তর করতে হবে।’

১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কঠোর সামরিক নিরাপত্তার মধ্যে ঢাকায় আসেন। কোনো সহযোগী ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও শেখ মুজিবুর রহমান ১৬ মার্চ ’৭১ প্রথম দফা বৈঠকে মিলিত হন। পরে এ আলোচনা মুলতবী হয়ে যায়। ১৭ মার্চ দ্বিতীয় দফা বৈঠকে দুপরে পরামর্শদাতারাও যোগ দিলেন। প্রেসিডেন্ট ভবনে রাতে ইয়াহিয়া ও টিক্কা খানের সংক্ষিপ্ত বৈঠক হয়। রাত ১০টায় গভর্নর টিক্কা খান জিওসি মেজর জেনারেল খাদেম হোসেন রাজাকে ফোনে বাঙালি নিধনযজ্ঞের নীল নকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। এদিকে ইয়াহিয়া-মুজিব তৃতীয় বৈঠকে মিলিত হন। ইয়াহিয়া এই বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনার ভান করলেও আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ায় জনগণ চূড়ান্ত সংগ্রামের প্রস্তুতি নেয়। শুরু হলো প্রতিরোধ আন্দোলন। ১৯ মার্চের ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক প্রায় ৯০ মিনিট স্থায়ী হয়, পরে সন্ধ্যায় তাদের পরামর্শদাতারা আলাদা বৈঠকে বসেন। ২০ মার্চ বসে মুজিব-ইয়াহিয়া চতুর্থ বৈঠক, যার শেষ দিকে দুপুরে পরামর্শদাতারাও নানা ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনায় বসেন। অন্যদিকে এ অঞ্চলের গণহত্যার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলে ফ্ল্যাগস্টাফ হাউজে। জেনারেল আব্দুল হামিদ খান এই বৈঠকে জেনারেল টিক্কা খানকে গণহত্যার নীল নকশা ’অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়নের সবুজ সংকেত দেন।

২১ মার্চ জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় এসে ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠকে সমঝোতার সমালোচনা করলেন। তিনি বললেন, সমস্যা সমাধানে ত্রি-পক্ষীয় সমঝোতা হতে হবে। এই মর্মে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া, শেখ মুজিব ও ভুট্টোর মধ্যে আলোচনা চলে। কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই ছিল আলোচনার নামে প্রহসন। এই দীর্ঘ আলোচনা পশ্চিমী সামরিক বাহিনীকে জাহাজ ও বিমানযোগে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব বাংলায় প্রচুর অস্ত্র ও সৈন্য আনার সুযোগ করে দেয়।

শেখ মুজিবর রহমান ২৭ মার্চ সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল ঘোষণা করেন। এই পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করলেন। দেশবাসী এমনকি বিশ্ববাসীও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও পূর্ব পাকিস্তানের বিজয়ী সংখ্যাগুরু দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে সমঝোতার ব্যাপারে কিছুটা আশাবাদী ছিল। কিন্তু বর্বর হানাদার পাকবাহিনী নৃশংস পাশবিকতায় বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ২৫ মার্চের কালো রাতে। সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ৯৬টি ট্রাকবোঝাই সৈন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে শহরে ঢুকল। তাদের সঙ্গে ছিল অটোমেটিক রাইফেল, মর্টার ফিল্ডগান, মেশিনগান, লাইট মেশিনগান, বাজুকা ইত্যাদি সব মারণাস্ত্র। সঙ্গে ট্যাঙ্কবহর। তখনও বারোটা বাজেনি, হানাদার নরপশুরা ট্যাঙ্ক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করল রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর ক্যাম্প, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে। এমনকি মেয়েদের রোকেয়া হলও নিস্তার পেল না। রাস্তায় রাস্তায় জমে উঠল লাশের স্তূপ। গ্রেফতার করা হয় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল আওয়ামী লীগ প্রধান বাঙালির তৎকালীন প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। গ্রেফতারের পূর্বে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

পরিকল্পিত গণহত্যার মুখে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধযুদ্ধ; জীবন বাঁচাতে প্রায় ১ কোটি মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, সামরিক বাহিনীর বাঙ্গালী সদস্য এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ দেশকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কব্জা থেকে মুক্ত করতে কয়েক মাসের মধ্যে গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী। গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে মুক্তিবাহিনী সারাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সাহায্য লাভ করে। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পতন আনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন পরিস্থিতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অত:পর ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরিভাবে জড়িয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে ইতোমধ্যে পর্যদুস্ত ও হতোদ্যম পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান ৯৩,০০০ হাজার সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এরই মাধ্যমে নয় মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসান হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি জাতির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

এমএস


oranjee