ঢাকা, রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

 
 
 
 

মশা থেকে সাবধান

এখন বর্ষা: ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রভাব বাড়ছে

গ্লোবালটিভিবিডি ৪:১৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৮, ২০১৯

ফাইল ছবি

বর্ষা আসার সাথে সাথে রাজধানীতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টিপাত বাড়লে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ে। এ কারণে এখনই এটি মোকাবেলা বা সচেতন না হলে তা মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে বর্ষার স্বচ্ছ, পরিষ্কার পানিতে মশার বংশ বিস্তার এই মৌসুমকে নানা সঙ্কটের আবর্তে ফেলে দেয়। এডিস মশার বংশবিস্তার বর্ষাকালের এক বিপজ্জনক অবস্থা; যা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির দিকে ঠেলে দিচ্ছে মানুষকে।

হলি ফ্যামিলির সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, এ বছর অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগীই আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি হচ্ছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।

হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রভাব শুরু হয়েছে গত মে’র কাছাকাছি সময় থেকে। ১ মে থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত ৬৮ দিনের মধ্যে ৩০ দিন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি করেছে হাসপাতালটি। এই ৩০ দিনে গড়ে সাতজনের বেশি (৭ দশমিক ৪) মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে ভর্তি হন।

হাসপাতালটির রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রোগীদের সবাই ঢাকা মহানগরীর। ঢাকার বাইরের কাউকে ডেঙ্গু নিয়ে এ হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি। যেসব এলাকার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইস্কাটন, মতিঝিল, মিন্টো রোড, রামপুরা, খিলগাঁও, বনগ্রাম, মগবাজার, শান্তিবাগ, মালিবাগ, বসুন্ধরা, শান্তিনগর, ওয়ারী, দারুস সালাম, বেগুনবাড়ি, সিদ্ধেশ্বরী, বাসাবো, রাজাবাজার, কে বি ঘোষ রোড, কলাবাগান, শাহাজাদপুর, মানিকনগর, বনশ্রী, টিকাতলী, গ্রিন রোড, বাড্ডা, গুলবাগ, কাফরুল, শাহাজাহানপুর, সবুজবাগ, বেগমবাড়ি, সতীশ সরকার রোড, বেইলি রোড, কাকরাইল, পুরানা পল্টন, নতুন পল্টন, নারিন্দা, অতীশ দীপঙ্কর রোড, মিরপুর, ফকিরাপুল, ফ্রি স্ট্রিট, তেজকুনিপাড়া। এদের মধ্যে ইস্কাটন, সিদ্ধেশ্বরী, রামপুরার রোগী তুলনামূলক বেশি।

গত ৪ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে ও ডেঙ্গু চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন সম্পর্কিত এক জরুরি সভায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ডেঙ্গুর প্রার্দুভাব আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে চিকিৎসক ও রোগীদের জন্য অবশ্যই করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করা হয়েছে।

অবশ্যই করণীয় : সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা অবশ্যই জাতীয় গাইড লাইন-২০১৮ অনুসারে প্রদান করতে হবে। ডেঙ্গু মৌসুমে যে কোনো জ্বরের রোগীকে চিকিৎসার জন্য দ্রুততার সঙ্গে রেজিস্টার্ড ডাক্তার বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হতে হবে। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে সঠিক ফ্লুইড ব্যবস্থাপনাই সঠিক চিকিৎসা। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অবশ্যই গাইড লাইন অনুসরণ করতে হবে। ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে যাদের কো-মরবিডিটি আছে (শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী ও ডায়াবেটিস) তাদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে হবে এবং চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। ডেঙ্গু কেস, মশা ও ভাইরাস সম্পর্কিত সার্ভিল্যান্স (নজরদারি) বৃদ্ধি করতে হবে। সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনা (কমিউনিটি, প্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় পর্যায়) আরও জোরদার করতে হবে।

অবশ্যই বর্জনীয় : ডেঙ্গু রোগীকে প্যারাসিটামল ছাড়া এনএসএআইডি, স্টোরোয়েড, ফ্রেস ফ্রোজেন প্লাজমা ও প্লাটিলেট কনসেনট্রেট দেয়া যাবে না। অনিবন্ধিত স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী/স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে জ্বরের চিকিৎসা করাবেন না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় ঘনবসতির পাশাপাশি ইদানীং নির্মাণাধীন ভবন ও রাস্তাঘাটে নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখার ফলে অনেক স্থানে বৃষ্টির স্বচ্ছ পানি জমে যায়। যা কিনা এডিস মশা প্রজননের উৎকৃষ্ট স্থান।

চিকুনগুনিয়া রোগের লক্ষণ ও উপসর্গসমূহ : সাধারণ জ্বর বা ডেঙ্গু জ্বরের সাথে সাদৃশ্য থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকুনগুনিয়া একটু ভিন্ন রকম হয়। সাধারনত মশা কামড়ানোর ৩ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এই জ্বরের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও, কোনো উপসর্গই প্রকাশ পায় না। এ রোগটি সাধারণত আকস্মিক জ্বর, অস্থিসন্ধির ব্যথার মাধ্যমে শুরু হয়। নিম্নে চিকুনগুনিয়া জ্বরের লক্ষণ বা উপসর্গগুলি বর্ণনা করা হল-

> চিকুনগুনিয়ার প্রথম লক্ষণই হল হঠাত্‍ করে উচ্চমাত্রার জ্বর আসা। আবার জ্বর চট করে ছাড়তেও চায় না। সাধারণত জ্বরের প্রচলিত ওষুধে অনেক সময় কোনও কাজই হয় না। এ জ্বর অনেকটা ডেঙ্গু জ্বরের মতোই। দেহের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে প্রায় ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে। এ জ্বরে কোন কাঁপুনি বা ঘাম হয় না। জ্বর সাধারণত ২ থেকে ৫ দিন থাকতে পারে, এরপর এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। এরকম লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিত্‍সকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

> চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে গাঁটের ব্যথা শুরু হয় । প্রথমে হাত এবং পা দিয়ে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ব্যথা অনুভূত হতে শুরু করে। ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকার ফলে শারীরিক দুর্বলতাও বাড়তে থাকে।

> চিকুনগুনিয়া জ্বরের ফলে গাঁটের ব্যাথার পাশাপাশি পেশীর ব্যথার সমস্যাও দেখা যায়। অনেক সময় পেশী এতটাই শক্ত হয়ে যায় যে চলাফেরার সমস্যা শুরু হয় এবং ব্যাথা সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা হয়, এমনকি ফুলেও যেতে পারে। পেশিতে ব্যথা কিংবা অস্থিসন্ধির ব্যথা জ্বর চলে যাওয়ার পরও কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে যা অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে স্বাভাবিক কাজ করতে বাধা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যথা এতই বেশি হয় যে, রোগীর হাঁটতে কষ্ট হয় কিংবা সামনের দিকে বেকে হাঁটে।

> রোগের শুরুতেই ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রোগ শুরু হওয়ার দুই থেকে তিন দিন পর জ্বর কমতে শুরু করলে ফুসকুড়ির আবির্ভাব হতে পারে।অনিদ্রা হতে পারে।

> গায়ে লাল লাল দানার মতো র‍্যাশ দেখা যেতে পারে।

> কনজাংটিভাইটিস হতে পারে।

> চিকুনগুনিয়া জ্বরে অসহ্য মাথা ব্যথা হতে পারে। এই জ্বরে দীর্ঘসময় ধরে মাথা ব্যথার প্রভাব থাকতে পারে যা শারীরিকভাবে কষ্ট দেওয়ার পাশাপাশি ঘুমের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ব্যঘাত ঘটায়।

> এই জ্বর হলে শরীর অনেক দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারনে বার বার বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।

> জ্বর এবং ব্যথায় কাতর হয়ে অনেকের মধ্যে অবসাদের প্রভাব দেখা যেতে পারে। ফলে কোন কাজেই মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।

> অনেক ক্ষেত্রে চোখ লাল হয়ে যাওয়া বা চোখের মধ্যে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। আবার অনেক সময় চোখের ব্যথা এতটাই বেড়ে যায় যে আলোর দিকে তাকাতে সমস্যা হয় এবং চোখ জ্বালা করে।

> সাধারণত বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা অনেক বেশি হয় এবং উপসর্গগুলো বেশিদিন থাকে।

> ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর ভালো হয়ে গেলে কয়েকদিন দুর্বলতা বা ক্লান্তি লাগতে পারে কিন্তু সাধারণত এত দীর্ঘ সময় ধরে শরীর ব্যথা বা অন্য লক্ষণগুলো থাকে না।

> আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তক্ষরণ হয়, যা অনেক সময় খুব ভয়াবহ হতে পারে। কিন্তু চিকুনগুনিয়া রোগে ডেঙ্গু জ্বরের মতো রক্তক্ষরণ হয় না এবং রক্তের প্লাটিলেট খুব বেশি হ্রাস পায় না।

রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা : চিকিত্‍সকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা বিশেষ করে ভাইরাস পৃথকীকরণ, RT-PCR কিংবা সেরোলজির মাধ্যমে এ রোগ শনাক্ত করা যেতে পারে। রোগীর রক্তে ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া এন্টিবডি দেখে এ রোগ সনাক্ত করা যেতে পারে। এতে অনেক ক্ষেত্রে ২ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

চিকিত্‍সা : চিকুনগুনিয়ার চিকিত্‍সা মূলত রোগের উপসর্গগুলোকে নিরাময়ের মাধ্যমে করতে হয়। এ রোগের কোনো প্রতিষেধক নেই এবং কোন টিকাও এখনও পর্যন্ত আবিস্কার হয়নি। এ রোগে আক্রান্ত রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে এবং প্রচুর জল বা অন্যান্য তরল খেতে দিতে হবে। জ্বরের জন্য সাধারন প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। মাঝে মাঝে জল দিয়ে শরীর মুছে দেয়া যেতে পারে। চিকিত্‍সকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথার ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। নিজে নিজে কোন ওষুধ না খাওয়াই ভাল।

রোগীকে যেন মশা না কামড়ায় এ জন্য রোগীকে অবশ্যই মশারির ভেতরে রাখতে হবে। কারণ- আক্রান্ত রোগীকে কামড় দিয়ে, পরবর্তীতে কোনো সুস্থ লোককে সেই মশা কামড় দিলে ওই ব্যক্তিও এ রোগে আক্রান্ত হবেন।

প্রতিরোধ : চিকুনগুনিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকরী কোনো টিকা এখনও পর্যন্ত আবিস্কার হয়নি। এটি যেহেতু এডিস মশাবাহিত রোগ, তাই মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করা যেতে পারে। যেমন- ঘুমানোর সময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো, লম্বা হাতাযুক্ত জামা ও ট্রাউজার পরে থাকা, বাড়ির আশেপাশে জল জমতে না দেয়া ইত্যাদি। শুধু স্ত্রী জাতীয় এডিস মশা দিনের বেলা কামড়ায়। আবার এরা একবারে একের অধিক ব্যক্তিকে কামড়াতে পছন্দ করে। তাই দিনে ঘুমালেও অবশ্যই মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হবে। এ মশার ডিম জলে এক বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। বালতি, ফুলের টব, গাড়ির টায়ার প্রভৃতি স্থানে অল্প পরিমাণ জমে থাকা জলও ডিম পরিস্ফুটনের জন্য যথেষ্ট। যেহেতু এডিস মশা স্থির জলে ডিম পাড়ে তাই যেন বাড়ির আশেপাশে জল জমে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

এমএস


oranjee