ঢাকা, সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯ | ১০ ভাদ্র ১৪২৬

 
 
 
 

বাংলাদেশের ঐতিহ্য ‘জামদানি’ নকলের সাথে লড়ছে

গ্লোবালটিভিবিডি ৭:২৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৮

কারুকাজ খচিত জামদানি। ছবি: সংগ্রহ

জামদানি শাড়ি বাংলোদেশের গর্ব হলেও এর সঙ্গে জড়িত কারিগররা খুব ভালো নেই। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও সঙ্কট কাটছে না এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারিগরদের। সংশ্লিষ্টরা জানান, সৌন্দর্য, নকশা, বুনন আর ঐতিহ্যে এ দেশের গর্বের পণ্য জামদানি। ইউনেস্কোর ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ তালিকাতেও রয়েছে জামদানি। কিন্তু জামদানির ব্র্যান্ডিংয়ে সরকারি-বেসরকারিভাবে যে উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল তা হয়নি। এই শিল্পের উদ্যোক্তাদের মিলছে না স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদী ব্যাংক ঋণ। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাঁতিরা অনেকেই অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। অথচ কারুকার্য ও বাহারি নকশার ফলে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে এখনও জামদানি শাড়ির কদর দেশের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে। আর এটাকেই পুঁজি করে নকল জামদানিতে বাজার ভরে গিয়েছে। দাম কম হওয়ায় ক্রেতারা নকল জামদানি কিনে হচ্ছেন প্রতারিত ।

ঢাকার জামদানি ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভারতে তৈরি উপ্পাদা জামদানিকে ঢাকাই জামদানি বলে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ কোনো দেশ জামদানি উৎপাদন কিংবা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করতে চাইলে স্বত্ব দিতে হবে বাংলাদেশকে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট রুবি গজনবী বলেন, চোরাই পথে এসে উপ্পাদা জামদানি ‘আসল জামদানি’ বলে বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, বাজার নকল জামদানিতে ভরে গিয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইলের শাড়িতে কিছু বুটিক করেই জামদানি বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

গজনবী বলেন, যেখানে একটি জামদানি শাড়ির দাম হওয়ার কথা ২০ হাজার টাকা, তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায়। এগুলোতো আসল জামদানি নয়।

তিনি বলেন, আমাদের জামদানি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এটা কিন্তু জাতীয় স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেতে আমাদের আরও ধাপ পেরতে হবে। জামদানি শাড়ি পছন্দ করেন না এমন নারী বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর এই চাহিদাকেই পুঁজি করে নকল জামদানিতে বাজার ভরে গিয়েছে। সাধারণের চেনার উপায় নেই- কোনটি আসল আর কোনটি নকল জামদানি।

জামদানি শাড়ি কয়েক ধরনের। যেমন-সুতি জামদানি, হাফ সিল্ক জামদানি, সিল্ক জামদানি। সম্পূর্ণ হাতের বুননের জামদানিই প্রকৃতপক্ষে আসল জামদানি। হ্যান্ডলুমের জামদানি পরতে যেমন আরামদায়ক, টিকেও অনেক বছর। অন্যদিকে, পাওয়ার লুমের জামদানি আসলে কোনো জামদানিই না। এ ধরণের শাড়ির ডিজাইন নকল করে পলিয়েস্টার সুতোয় বুনে অল্প দামে তা বিক্রি করা হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকার বেইলী রোডের এক জামদানি শাড়ি বিক্রেতা বলেন, আসল-নকল জামদানির পার্থক্য তো দামেই। তিনি বলেন, আমাদের ক্রেতাদের জামদানির প্রতি দুর্বলতা আছে। আর এটাকেই পুঁজি করে টাঙ্গাইল ও রাজশাহীর শাড়িতে জামদানির নকশা করে তা জামদানি বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভারত থেকেও এ ধরনের শাড়ি প্রচুর আসছে। এগুলো আসলে নকল জামদানি। তবে দাম কম হওয়ায় ক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা রয়েছে। এই পলিয়েস্টার জামদানি দীর্ঘক্ষণ পরে থাকলে অস্বস্তি বোধ হয়। এছাড়া ত্বকের নানা সমস্যা হতে পারে।

সোনারগাঁওয়ের একটি জামদানি তৈরির কারখানায় কাজ করছেন কারিগররা। ছবি: সংগ্রহ

বাংলাদেশে বর্তমানে জামদানি শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ৬৮ হাজারেরও বেশি মানুষ সম্পৃক্ত। জামদানির চাহিদা থাকার পরও দুর্দশাগ্রস্ত জীবন কাটাচ্ছেন এ শিল্পের কারিগররা। কারণ নকল জামদানিতে বাজার ভরে যাওয়ায় হাতের তৈরি জামদানির আসল কারিগররা ক্ষতির স্বীকার হচ্ছেন। হাতে একটি জামদানি তৈরি করতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগে।

ঢাকার অদূরে রূপগঞ্জের আনোয়ার জামদানির অন্যতম স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গির হোসেন জানান, রূপগঞ্জে যেসব জামদানি তৈরি হচ্ছে সেগুলো আসল জামদানি। কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় হাতে বোনা আসল জামদানি কম চলে। তিনি বলেন, ক্রেতারা তো বুঝতে চান না। তারা নকল জামদানি কেনেন। কম টাকায় তো জামদানি শাড়ি হবে না।

তিনি আরও বলেন, জামদানি বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ হলেও সরকারের এ শিল্পের প্রতি নজর নেই। আমরা ব্যাংক থেকে ঋণ পাই না। নেই কোনো সুযোগ-সুবিধাও। অথচ আমরা এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছি।

জাহাঙ্গির বলেন, রূপগঞ্জে জামদানি পল্লীতে আর অল্প কয়েকটা তাঁত আছে। দিনদিন কারিগরদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তারা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। চাহিদার উপর ভিত্তি করে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পে পণ্য বৈচিত্র্যকরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন শুধু শাড়ি নয়, পাঞ্জাবি, ফতুয়া-সহ বিভিন্ন পোশাকেও জামদানির নকশা ব্যবহার করা হচ্ছে। রপ্তানি ও বিক্রি বাড়াতে জামদানি শাড়ির দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখা এবং ঐতিহ্যবাহী এ শাড়ির রং ও নকশার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে গবেষণা করা উচিত। সেইসঙ্গে জামদানির নামে নকল জামদানি বিক্রিও বন্ধ করতে হবে।

সূত্র: সংবাদ প্রতিদিন

 

এসএনএ

 

 


oranjee