ঢাকা, সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

কালোবাজারি ও বিষাক্ত সোডিয়াম সালফেট ধ্বংস করছে দেশীয় লবণ শিল্প

গ্লোবালটিভিবিডি ৮:৪৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৪, ২০১৯

জসীম উদ্দীন, কক্সবাজার: বিগত ৫৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লবণ উৎপান হয়েছে এ বছর। এরপরও লবণের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না চাষিরা। নতুন করে আমদানির পাঁয়তারা চলছে। কালো বাজারি, উৎপাদিত লবণের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া ও বিষাক্ত সোডিয়াম সালফেটের কারণে ধ্বংস হচ্ছে দেশীয় লবণ শিল্প। মাঠে ও মিলে পড়ে রয়েছে অন্তত ৬ লাখ মেট্রিক টন অবিক্রিত লবণ। লবণের সঠিক চাহিদা নিরূপনে বিসিকের ব্যর্থতা ও কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কালো বাজারিদের লবণ আমদানির কারণে দেশীয় লবণ খাত মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না। উঠে আসার পথে আবার পিছিয়ে যাচ্ছে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ খাত। সামনের মৌসুমে লবণ চাষিরা মাঠে যাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কক্সবাজারের লবণ শিল্প উন্নয়ন প্রকল্প কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে দেশে লবণের চাহিদা ছিল ১৫ দশমিক ৭৬ লাখ মেট্রিক টন। এই মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ১৩ দশমিক ৬৪ লাখ মেট্রিক টন। এ হিসাবে চাহিদার তুলনায় লবণের ঘাটতি ছিল ২ লাখ ১২ হাজার মেট্রিক টন। সেই বছর ৫ লাখ মেট্রিক টন আমদানি বাদে ২ লাখ ৮৮ মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত থাকে।

অবৈধভাবে দেশে ঢুকছে লবণ

২০১৮ সালে ১৬ লাখ ২১ হাজার মেট্রিক টন লবণ চাহিদা ছিল। এই বছর ১৪ লাখ ৯৩ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন হয়। ঘাটতি থাকে ১ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৭ সালের উদ্বৃত্ত ২ লাখ ৮৮ মেট্রিক টন বাদে চাহিদার তুলনায় ১ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন লবণ উদ্বৃত্ত ছিল।

২০১৭-২০১৮ সালে ১ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন লবণ উদ্বৃত্ত থাকলেও কালোবাজারিদের মাধ্যমে অবৈধভাবে দেশে ঢুকে পড়ে প্রায় ৯ মেট্রিক টন লবণ। যা বাজারে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। এখনো চট্টগ্রাম বন্দরে বাইরের লবণ খালাসের তথ্য আছে।

লবনমিল মালিকদের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিসিকের অসাধু কর্তারা কারসাজি করে কালোবাজারিদের সুযোগ করে দেয়। যে কারণে বারবার দেশীয় লবণশিল্প মার খাচ্ছে। উদ্বৃত্ত থাকার পরও প্রতি বছর লবণ আমদানি করা হয়। টেক্স ফ্রি সোডিয়াম সালফেট ছড়িয়ে দিচ্ছে বাজারে।

সোডিয়াম সালফেটে পিএইচ ৯ থাকে। যা কলকারখানায় ব্যবহার হয়। এই লবণ খাদ্য অনুপযোগী ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ভোজ্য লবণে পিএইচ থাকে ৭। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সোডিয়াম সালফেট বাজারে বিক্রি করছে। যা মানবজীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

কক্সবাজার, চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলা (আংশিক)সহ ৬৪ হাজার ১৪৭ একর জমিতে ৫৫ হাজারের বেশি চাষি লবণ চাষ করে। কিন্তু দালাল, ফঁড়িয়া ও আমাদানির চক্রে বারবার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চাষিরা। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে এ লবণ আমদানি করে।

লবণ মিল মালিক, ব্যবসায়ী, চাষিসহ সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশীয় লবণশিল্প বাঁচাতে সমস্ত লবণ আমদানি বন্ধ করতে হবে। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে না পারলে মাঠে ফেরানো যাবে না চাষিদের। লবণের পরনির্ভর হবে দেশ, বাড়বে বেকারত্ব। সোডিয়াম সালফেটের আড়ালে যারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট, সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি করে তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।

২০১৮-১৯ অর্থ বছরে আমাদের লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ লাখ মেট্রিক টন। চাহিদা ছিলো ১৬ দশমিক ৫৭ লাখ মেট্রিক টন। চাহিদার তুলনায় এবার বাম্পার উৎপাদন হয়েছে। বিগত ৫৮ বছরের মধ্যে এ বছরের যে লবণ উৎপাদন হয়েছে তা অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। তবু লবণের নায্য মূল্য না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন চাষিরা।

৭৪/৭৫ কেজির অপরিশোধিত লবণের বস্তা ২৩০-২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর পরিশোধিত বস্তাপ্রতি ৬৪০-৬৭০ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। যা বিগত মৌসুমের দামের প্রায় এক তৃতীয়াংশ। ২০১৮ সালে সরকারীভাবে লবণ আমদানি না হলেও চোরাই পথে ঠিকই ঢুকেছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে দেশীয় লবণ শিল্পকে বাঁচানো যাবে না।

বিসিক কক্সবাজারের উপমহাব্যবস্থাপক সৈয়দ আহামদ বলেন, একটা শ্রেণি লবণ আমদানির জন্য সরকারকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে। বিসিকের চাহিদার তুলনায় প্রচুর লবণ বেশি মজুদ আছে।

জেইউ/এমএস


oranjee