ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

 
 
 
 

নজরদারিতে ঢাকার ১৮ কাউন্সিলর

অবৈধ সম্পদের খোঁজে চলছে অনুসন্ধান, দেশত্যাগ রোধে বিশেষ সতর্কতা

গ্লোবালটিভিবিডি ৩:১০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০১৯

মোয়াজ্জেম হোসেন নাননু : আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, দখল, মাদক, জুয়া, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে ঢাকার দুই সিটির ১৮ কাউন্সিলর ও তাদের সম্পদ গোয়েন্দা নজরদারিতে। তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে ওঠা অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে সরকারের একটি সংস্থা। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর সব অভিযোগের তদন্ত শুরু করছে সংস্থাটি। পাশাপাশি তাদের কেউ যেন হঠাৎ দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য নেয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। ইতিমধ্যেই সংস্থাটির পক্ষ থেকে দেশের স্থল ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে কর্মরত ইমিগ্রেশন পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছে। একই সাথে অন্যান্য কাউন্সিলরদের ব্যাপারেও খোঁজ-খবর নিচ্ছে সংস্থাটি।

দেশব্যাপি পরিচালিত শুদ্ধি অভিযানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গ্লোবাল টিভি বিডিকে বলেছেন, কাউন্সিলরদের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে দুই সিটি মেয়রের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন। ইতিমধ্যেই এ ব্যাপারে দুই সিটি মেয়রের সাথে সংস্থাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কয়েকদফা কথা বলেছেন। দুই মেয়র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, শুদ্ধি অভিযানে যে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত রয়েছেন।

সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন ওই কর্মকর্তা গ্লোবাল টিভি বিডিকে আরো বলেছেন, দুই সিটি কর্পোরেশনের ১৮ কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ১৮ কাউন্সিলর ছাড়াও আরো কয়েকজন কাউন্সিলরের ব্যাপারেও খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। একই সাথে তাদের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে যে ১৮ জনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত হচ্ছে তাদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটির (ডিএনসিসি) ৯ জন এবং দক্ষিণ সিটির (ডিএসসিসি) ৯ কাউন্সিলর রয়েছেন। এরা হচ্ছেন, ডিএসসিসির ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আশ্রাফুজ্জামান (ফরিদ), ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোস্তফা জামান পপি, ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ রতন, ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী তরিকুল ইসলাম সজীব, ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিক, ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হাসান, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু এবং ৭৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আবুল কালাম। ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র মো. জামাল মোস্তফা, ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. রজ্জব হোসেন, ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মোবাশ্বের হোসেন, ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান (ইরান), ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফোরকান হোসেন, ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল হাসেম (হাসু), ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শফিকুল ইসলাম সেন্টু। তদন্তের পাশাপাশি এ সকল কাউন্সিলররা নজরদারির মধ্যে আছেন বলে গ্লোবাল টিভি বিডিকে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এছাড়া অবৈধভাবে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়া ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জমান রাজিব ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ইতিমধ্যেই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছেন।

অন্যদিকে ডিএনসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর একেএম মমিনুল হক সাঈদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই তিনি সিঙ্গাপুর পালিয়ে গেছেন বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন। জবরদখল ও ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত থাকার ঘটনা ফাঁস হওয়ায় গ্রেফতারের ভয়ে তিনি দেশে ফিরছেন না। এদিকে শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর থেকেই যেসব কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা সিটি কর্পোরেশনের বৈঠকেও হাজির হচ্ছেন না। অন্যদিকে নিয়মিত সভায় অনুপস্থিত থাকা এবং ছুটি ছাড়া দেশের বাইরে যাওয়ার বিয়টি দুই সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। খুব গিগিরই এসব কাউন্সিলরদের কারণ দর্শানো (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না মিললে এসব কাউন্সিলররা বরখাস্ত হতে পারেন বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তালিকাভুক্ত কাউন্সিলরদের বেশির ভাগই গা ঢাকা দিয়েছেন। অফিস বা বাসায় তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। সেবাগ্রহীতারাও তাদের সাক্ষাৎ পাচ্ছেন না। ওয়ার্ড সচিব বা কাউন্সিলের ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে চলছে সেবা কার্যক্রম। গত দুই দিনে (শুক্র ও শনিবার) গ্লোবাল টিভি বিডির পক্ষ থেকে নজরদারির আওতায় থাকা এসব কাউন্সিলরের মধ্যে অন্তত ১১ জনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মধ্যে ৯ জনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বাকি দু‘জনের মোবাইল সচল থাকলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।

ডিএসসিসির ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ রতনের ফোন সচল থাকলেও তিনি কারো ফোন রিসিভ করছেন না। এ কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ডিএনসিসির মার্কেটে দখল, চাঁদাবাজিসহ বহুবিধ অভিযোগ রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাকে নজরদারির মধ্যে রেখেছেন। একই সঙ্গে এই কাউন্সিলরের আশ্রয়প্রশ্রয়দাতাদের ব্যাপারেও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেছেন, কোনো কাউন্সিলরের অপকর্মের দায় সিটি করপোরেশন নেবে না। কমিউনিটি পুলিশিং ডে উপলক্ষে শনিবার সরকারি তিতুমীর কলেজের আয়োজিত সুধী সমাবেশে একথা বলেন তিনি। অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনায় ঢাকা দক্ষিণের এক কাউন্সিলরের নাম আসার পর র‌্যাবের অভিযানে নানা অভিযোগে উত্তরের দুজন কাউন্সিলর ধরা পড়েন। অভিযানের মুখে গা ঢাকা দিয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর।

মেয়র আতিক বলেন, কিছু কাউন্সিলরের নানা অপকর্মের জন্য তার ‘দুঃখ হয়’। তিনি বলেন, “আমি নিজে চাঁদাবাজি করি না, কাউকে চাঁদা দিইও না। কেউ যদি মাদক ব্যবসা করে, চাঁদাবাজি করে, দখলদারী করে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। এখানে ডিএনসিসির কিছু বলার নেই। যার যার অপকর্মের দায় তার নিজের।”

এমএইচএন/এমএস


oranjee

আরও খবর :