ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯ | ৪ আষাঢ় ১৪২৬

 
 
 
 

পাঠাও’র বিরুদ্ধে যাত্রী হয়রানির অভিযোগ

শোষণের অভিযোগ রাইডারদের

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ, মে ৩১, ২০১৯

মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু: অ্যাপসভিত্তিক মোটরবাইক ও গাড়ি রাইড সার্ভিস প্রদানকারী কোম্পানি ‘পাঠাও’-এর বিরুদ্ধে যাত্রী হয়রনির অভিযোগ অনেক পুরানো। ভাড়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এনে এর আগে প্রতিষ্ঠানটিকে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। সেই অভিযোগের সুরাহা না হতেই এবার শুরু হয়েছে ‘ডিজিটাল পেমেন্ট’ বিতর্ক। বিকাশের মাধ্যমে রাইডের ভাড়া দেওয়া নিয়ে প্রতিদিনই সেবা গ্রহণকারীদের সাথে বাইকারদের বাদানুবাদের ঘটনা ঘটছে। হাতাহাতির মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে মাঝে-মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ধরণের প্রতারণা ও অশালীন আচরণের অভিযোগ করছেন অসংখ্য পাঠাও ব্যবহারকারী।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে রাইডারদেরও অভিযোগের অন্ত নেই। অনেক রাইডার খোদ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই শোষণের অভিযোগ তুলেছেন। সব মিলিয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে পাঠাও চালকরা। এসব অভিযোগের বিষয়ে গ্লোবালটিভির পক্ষ থেকে বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কয়েকদফা যোগাযোগ করা হয়। অভিযোগগুলো প্রশ্ন আকারে মেইল করা হলেও দীর্ঘদিনে উত্তর মেলেনি।

মতিঝিলে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বিকাশের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি চালু হওয়ার পর থেকেই তিনি চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। গ্লোবাল টিভিকে তিনি বলেন, অধিকাংশ বাইকার ডিজিটাল পেমেন্ট নিচ্ছেন না। বিকাশ পেমেন্টের পরিবর্তে তারা ক্যাশ দাবি করছেন। অনেক ক্ষেত্রে বাইকাররা অশালীন আচরণও করছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

রামপুরার বাসিন্দা সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, তার অফিস উত্তরায়। প্রতিদিন তিনি পাঠাওয়ে অফিসে যাওয়া-আসা করেন। তার অভিযোগ, দীর্ঘক্ষণ চেষ্টার পর রাইডস পেলেও বাইকাররা নিজ থেকে যোগাযোগ করেন না। একটি ফোন কলের টাকা বাঁচাতে তারা উল্টো যাত্রীদের ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। যাত্রীরা ফোন করলেই বাইকারদের প্রশ্ন, পেমেন্ট ক্যাশ না বিকাশে? বিকাশ শুনলেই অভদ্রের মতো কথা না বলেই ফোন কেটে দিচ্ছেন। অন্যদিকে অনলাইনে রিকোয়েস্ট রিসিভের পর যোগাযোগ না করে দীর্ঘক্ষণ লাইনে রাখছেন। এতে মূল্যবান কর্মঘন্টা নষ্টের পাশাপাশি মোবাইল ডাটা ব্যবহারে যাত্রীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন বলে সাজ্জাদুল ইসলামের অভিযোগ।

অ্যাপসভিত্তিক মোটরবাইক (পাঠাও) ব্যবহারকারী সিরাজুল ইসলামের অভিযোগ অনেক সময় নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর পর বাইকাররা যাত্রীদের কাছে বিকাশের পরিবর্তে ক্যাশ দাবি করছেন। বিকাশের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধে ডিসকাউন্ট অফার থাকায় যাত্রীরা নগদ টাকা দিতে না চাইলেই শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক। এ নিয়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।

এ ধরণের অভিযোগ পাওয়ার পর সত্যতা যাচাইয়ে পাঠাওয়ের যাত্রী হিসাবে চলাচলের সময় এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় বেশ কিছু বাইকারের। যাত্রীদের হয়রানির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বেশির ভাগ বাইকার উল্টো পাঠাও কোম্পানীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তীঁর ছোঁড়েন। তারা বলেন, বিকাশ পেমেন্ট চালু হওয়ার পরে তারাও অ্যাপসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পাঠাওয়ের কাছ থেকে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, যাত্রী যে পেমেন্ট করছেন তা পাঠাও’র বিকাশ অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে। কোম্পানীর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে তাদের পাঠাও অফিসে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে। অনেক বাইকার অভিযোগ করেন, প্রতিদিন বাইকের জন্য যে তেল কিনছেন সে টাকাও কোম্পানির অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে। আর এ টাকা উঠাতে তাদের দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে। এতে তারা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, যাত্রী বাড়াতে ব্যবসার কৌশল হিসেবে এর আগে পাঠাও কর্তৃপক্ষ সরাসরি রাইড ভাড়ার ওপর প্রতিবার ডিসকাউন্ট দিতো। নগদ টাকার ওপর এ ডিসকাউন্ট শতকরা ৬০ থেকে ৭৫ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হতো। অতিরিক্ত রাইড ব্যবহারকারীদের কখনও কখনও শতভাগ ডিসকাউন্ট (ফ্রি) দেয়ার কথাও শোনা গেছে। বর্তমানে যাত্রীরা শুধুমাত্র ডিজিটাল (বিকাশ) পেমেন্টেই এ ডিসকাউন্ট পেয়ে থাকেন।

গত বছর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এ ব্যাপারে দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশ লিমিটেডের সঙ্গে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা প্রতিষ্ঠান পাঠাও।

এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা পাওয়ার পর পাঠাও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করে গ্লোবাল টিভি বাংলাদেশ। অফিসে যোগাযোগের পর সাড়া না মেলায় গত ২ মে পাঠাও অ্যাপসে প্রথম যোগাযোগ করা হয়। নিজের পরিচয় দিয়ে রিপোর্ট সংক্রান্ত তথ্যের বিষয়ে জানতে চাওয়ার পর মেসেঞ্জারের মাধ্যমে প্রশ্নগুলো জানতে চাওয়া হয়। প্রশ্নগুলো মেসেঞ্জারে সেন্ট করার পর ফিরতি মেসেজে জানানো হয়, ‘আপনি কি আর কিছু জানাতে চাচ্ছেন ?, না সংক্রান্ত উত্তর দেয়ার পর ফিরতি মেসেজে জানানো হয়, ‘ধন্যবাদ আপনার মেসেজের জন্য। আমরা খুব শিঘ্রই আপনার সাথে যোগাযোগ করবো’। তবে সাড়া না পাওয়ায় ৪ মে গ্লোবাল টিভির পক্ষ থেকে ফের যোগাযোগ করা হয়। এসময় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, এ বিষয়ে তারা কোনও কথা বলবেন না।

পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহের পর ৮ মে এ প্রতিবেদক কথা বলেন, পাঠাও-এর মার্কেটিং অফিসার অ্যান্ড পিআরও নাবিলা মাহবুবের সঙ্গে। প্রথমে কথা বলতে না চাইলেও পরবর্তীতে অভিযোগগুলো মেইল করতে বলেন। পরবর্তীতে মেইলের মাধ্যমে অভিযোগগুলো জানিয়ে উত্তরের জন্য ৩০ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও তা পাওয়া যায়নি।

এর আগে গত নভেম্বরে ভাড়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে অ্যাপসভিত্তিক মোটরবাইক ও গাড়ি রাইড সার্ভিস প্রদানকারী কোম্পানি ‘পাঠাও’ এর বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম। রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মো. আফজাল হোসেনের পক্ষে তিনি এ নোটিশটি পাঠান। পাঠাও লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী এবং প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা বরাবরে এ নোটিশটি পাঠানো হয়।

এর আগে সিলেটে এক সংবাদ সম্মেলনে পাঠাওয়ের বিরুদ্ধে শোষণের অভিযোগ আনেন ফ্রিল্যান্স রাইডারস এসোসিয়েশন অব সিলেটের নেতৃবৃন্দ। সংবাদ সম্মেলনে রাইডাররা বলেন, প্রায় সমপরিমাণ খরচ হলেও ‘পাঠাও’ কর্তৃপক্ষ ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে সিলেটের রাইডারদের অর্ধেক পারিশ্রমিক দিচ্ছে। এই শোষণের বিরুদ্ধে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে ধর্ণা দিলেও কোন ইতিবাচক সাড়া পাননি, উল্টো নিরীহ রাইডারদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে ওই সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়। এসময় তারা আন্দোলন কর্মসূচিও ঘোষণা করেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে হুসাইন এম ইলিয়াস এবং সিফাত আদনানের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে পাঠাও। অবকাঠামোগত সমস্যা কমিয়ে বাস্তব ভিত্তিক সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করা পাঠাও এশিয়ার দ্রুত সম্প্রসারিত স্টার্টআপগুলোর অন্যতম।

এমএইচএন/এমএস


oranjee