ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

 
 
 
 

অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য

গ্রেফতারকৃতদের তথ্যে বিব্রত তদন্তকারী সংস্থা, বেরিয়ে আসছে রাঘব-বোয়ালদের নাম

গ্লোবালটিভিবিডি ৫:০৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৯

মোয়াজ্জেম হোসেন নাননু : প্রায় এক সপ্তাহ ধরে খড়গ চলছে অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্যের ওপর। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান এ অভিযানে এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের রাঘব-বোয়ালদের বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের একেক জনের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার। উদ্ধারকৃত বৈধ আর অবৈধ অস্ত্রের সংখ্যাও অনেক। অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্যের এসব গডফাদারদের গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‌্যাব ও পুলিশ। আর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে ক্যাসিনো বাণিজ্যে জড়িত ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী অনেক নেতার নাম। গ্রেফতার এড়াতে ইতিমধ্যেই তাদের অনেকেই গা-ঢাঁকা দিয়েছেন। এমনকি গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্যে সরকারের সাবেক একাধিক মন্ত্রীর নামও রয়েছে।

নিয়মিত মাসোহারার বিনিময়ে অবৈধ এ কর্মকাণ্ডকে নির্বিঘ্নে করতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর যেসব কর্মকর্তারা সহযাগিতা করেছেন তাদের নামও ফাঁস করেছেন গ্রেফতারকৃত অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্যের অন্যতম হোতা বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালিদ মাহমুদ ভূঁইয়া। ক্যাসিনো বাণিজ্যের অন্যতম গডফাদার খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার দেওয়া তথ্যে রীতিমতো হতবাক খোদ তদন্তকারী সংস্থা। বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপি সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
তার দেয়া তথ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী অনেক নেতা, সাংবাদিক ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন নেতার নাম রয়েছে। যুবলীগ দক্ষিণের বহিষ্কৃত সাংগঠিনক সম্পাদক খালিদ মাহমুদের মামলায় তদন্তের দায়িত্বে থাকা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এসব তথ্য ইতিমধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখাকে অবহিত করেছে। তবে বর্তমানে খালিদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে র‌্যাব হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এদিকে গত বুধবার রাজধানীতে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর সেগুনবাগিচা এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অবস্থানরত ৯ নেপালি নাগরিককে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছিলো আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য। বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে সাদা পোষাকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ৮ থেকে ৯ জন সদস্য ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে তাদেরকে দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর এসব সদস্যদের বেশ কয়েকজনের হাতে ওয়াকিটকি ছিলো। প্রায় ঘণ্টাখানেক অবস্থান শেষে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর এসব সদস্যরা ওই ফ্ল্যাট থেকে চলে যান। যাওয়ার সময় তাদের হাতে কয়েকটি বড় আকৃতির ব্যাগ দেখা যায়। এরও আধ ঘণ্টা পর ওই নেপালি নাগরিকরা একে একে ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যায়। ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য বিশেষ ওই জুয়ায় পারদর্শী নেপালি নাগরিকদের বাংলাদেশে আনা হয়েছিলো। তবে এ ঘটনার পর তারা বাংলাদেশ ছেড়েছেন নাকি কোথাও লুকিয়ে আছেন তা জানতে পারেনি পুলিশ। তবে ঘটনা জানাজানি হলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) শৃঙ্খলা বিভাগ ওই ফুটেজ দেখে ইতিমধ্যেই তিনজনকে সনাক্ত করেছে। এদের মধ্যে একজন রমনা থানার কনস্টেবল দীপঙ্কর চাকমা ও আরেকজন একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য আক্তার হোসেন। সনাক্তের পর বৃহস্পতিবার তাদের দু’জনকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বাকি সদস্যদের সনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গ্লোবালটিভিবিডিকে জানিয়েছেন।

অবৈধ ক্যাসিনো (এক ধরণের বিশেষ জুয়া) বন্ধে সরকার প্রধানের অনড় অবস্থান-প্রভাবশালী অনেক নেতাকেও আতংকিত করে তুলেছে। রাজধানীর বাইরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও অভিযান চালিয়েছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সর্বশেষ গত রোববার মতিঝিল ক্লাব পাড়ায় অভিযান চালিয়ে চারটি ক্যাসিনো সিলগালা করে দিয়েছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। তবে এক্ষেত্রে ভাগ্যবান কারওয়ানবাজারে মৎসজীবী ক্লাব নামে পরিচিত প্রগতি স্পোর্টিং ক্লাব ও এর সভাপতি মোশারফ হোসেন।
গত শুক্রবার বিকালে র‌্যাব-২ এর একটি দলঅভিযান চালাতে ওই ক্লাবটি ঘিরে ফেলে। প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর অদৃশ্য সূতোর টানে অভিযান না চালিয়েই ফিরে যায় র‌্যাবের ওই দলটি।

অভিযোগ উঠেছে, সরকারের প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ফোন পেয়ে অভিযান না চালিয়ে র‌্যাব সদস্যরা ফিরে যান। তবে অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া র‌্যাব-২ এর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্ণেল আশিক বিল্লাহ মুঠোফোনে গ্লোবালটিভিবিডিকে বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই ক্লাবটিতে অভিযান চালানো হয়। অভিযান পরিচালনার সময় ক্লাবটিতে কাউকে পাওয়া যায়নি।

র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, অভিযানের সময় সেখানে কয়েক জোড়া তাস ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। তবে কারওয়ানবাজারের একাধিক ব্যবসায়ী গ্লোবাল টিভি বিডিকে বলেছেন, কয়েক বছর ধরেই ক্লাবটিতে ক্যাসিনো নামক জুয়া চলে আসছে। স্থানীয় লোকজন ওই ক্লাবটিকে মৎসজীবী ক্লাব নামে চিনলেও প্রকৃতপক্ষে ক্লাবটির নাম প্রগতি স্পোর্টিং ক্লাব।

স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ক্লাবটি মূলত পরিচালনা করেন কারওয়ানবাজার মৎস্য আড়ৎ মালিক সমিতির নেতা ও তেজগাঁও থানা শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি মোশারফ হোসেন। অবৈধ এ ক্যাসিনো বাণিজ্যে তার সহযোগি লোকমান ও কাশেমসহ ক্ষমতাসীন দলের লেবাসধারী আরো কয়েকজন নেতা।

এই ভিডিওচিত্রের ছবি দেখেই দুই পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে

স্থানীয় সূত্র বলেছে, গত শুক্রবার ওই ক্লাবে যখন র‌্যাব অভিযান পরিচালনা করে তখনও তাকে কারওয়ানবাজার এলাকায় দেখা গেছে। এরপর থেকেই অদৃশ্য স্থানে চলে গেছেন মোশারফ হোসেন। সোমবার বিকালে গ্লোবালটিভিবিডির পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মোশরফ হোসেনের দু’টি মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত, শুক্রবার কারওয়ানবাজার মৎসজীবী ক্লাব অভিযান স্থগিত করে র‌্যাব-২ এর দলটি।

একই দিনে ক্যাসিনো বাণিজ্যের অভিযোগে রাজধানীর ধানমন্ডি ক্লাব, কলাবাগান ক্রীড়াচক্র ও এজাক্স ক্লাবে অভিযান চালায় র‌্যাব। এসময় কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের চেয়ারম্যান ও কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় নেতা শফিকুল আলম ফিরোজকে গ্রেফতার করে। এসময় র‌্যাব সদস্যরা তার কাছ থেকে হলুদ রঙের বিশেষ ইয়াবা, বিদেশি পিস্তল, ক্যাসিনোর সরঞ্জাম ও ৫৭২ প্যাকেট তাস উদ্ধার করে। এ ঘটনায় দায়েরকৃত দুই মামলায় বর্তমানে তিনি ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন।

এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর (বুধবার) অবৈধ জুয়া ও ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে প্রথম র‌্যাবের হাতে আটক হন ঢাকা দক্ষিণ মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। পরে অস্ত্র ও মাদকের পৃথক দুই মামলায় তাকে সাতদিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। পরের দিন ক্ষমতাসীন দলের আরেক নেতা গোলাম কিবরিয়া (জিকে) শামীমকে গুলশানের নিকেতনে তার আলিশান ভবন থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ও এফডিআর উদ্ধার করে। এসময় জিকে শামীম ও তার সাত দেহরক্ষীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। উদ্ধার করা হয় সাতটি শটগান ও একটি পিস্তল।

২৩ সেপ্টেম্বর অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর দায়ে মতিঝিলের আরামবাগ, দিলকুশা, ভিক্টোরিয়া ও মোহামেডান ক্লাবে তালা ঝুলিয়ে দেয় পুলিশ। একই সঙ্গে ক্লাবগুলো থেকে ক্যাসিনো ও জুয়া খেলার সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে প্রথম রাজধানীর মতিঝিলের ফকিরেরপুল ইয়ংমেনস ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ এবং গুলিস্থানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবে অভিযান চালায় র‌্যাব। অভিযানে চারটি ক্লাব থেকেই বিপুল পরিমাণ ক্যাসিনো ও জুয়ার সামগ্রী, মদ ও টাকা উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ গত ২৪ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) গ্রেফতার হন গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক এনু ও সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়া। এসময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও ৭৩০ ভরি স্বর্ণালংকার উদ্ধার করে র‌্যাব।

এমএইচএন/এমএস


oranjee