ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯ | ৪ আষাঢ় ১৪২৬

 
 
 
 

পাঠক গতানুগতিক থেকে বেরিয়ে নতুনের অন্বেষণ করে : হাসান রাজীব

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মাহতাব শফি ৪:৪৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ০১, ২০১৯

অমর একুশে বইমেলায় এবার ব্যাপক সাড়া ফেলেছে কবি, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হাসান রাজীবের দুইটি বই, ‘অরফিয়াসের বীণা’ ও ‘দিন কেটে যায় ছন্দে’। দুটি বইয়ের মূল্য রাখা হয়েছে ১৬০ টাকা করে। মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩৯৮ নম্বর ‘শুদ্ধপ্রকাশ’ স্টলে বই দুটি পাওয়া যাবে। তিনি কথা বলেছেন নতুন বই, বইমেলা ও তার লেখালেখি নিয়ে-

সাহিত্যে এলেন কেন এবং কিভাবে?

হাসান রাজীব: ধন্যবাদ। আসলে আমি সাহিত্যে এসেছি, বিষয়টি মোটেই এরকম নয়। বলা যেতে পারে সাহিত্য আমার রক্তে। আমার নানাজান ছিলেন লেখক। তার লেখা বই আমি পড়েছি। আমার বাবাও একটু আধটু লিখতেন। সেই শৈশব থেকেই বাবার সংগ্রহের দেশ-বিদেশের অনেক লেখক-কবি-সাহিত্যিকের বই আমি পড়েছি। লেখালেখির সূত্রপাতও তখন থেকেই। একসময় নিজেকে সাহিত্যের মধ্যে এমনভাবে আবিষ্কার করেছি যে এখন আর সাহিত্য ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারি না।

মেলায় এবার কী বই এসেছে?

হাসান রাজীব: এবার একুশের বইমেলায় শুদ্ধপ্রকাশের ব্যানারে আমার দুটি বই এসেছে। একটি কাব্যগ্রন্থ ‘অরফিয়াসের বীণা’। আরেকটি ছোটদের জন্য ছড়ার বই ‘দিন কেটে যায় ছন্দে’। দুটি বই-ই চমৎকার। আশা করি সব শ্রেণির পাঠকের মন জয় করবে বই দুটি।

নতুন বই সম্পর্কে বলুন

হাসান রাজীব: ‘অরফিয়াসের বীণা’ আমার প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ। যা এবারের বইমেলায় শুদ্ধপ্রকাশ বের করেছে। এই বইটিতে স্থান পাওয়া অধিকাংশ কবিতা দেশের প্রথম শ্রেণির পত্র-পত্রিকা ছাড়াও বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। ‘অরফিয়াসের বীণা’ বইটিতে স্থান পেয়েছে মোট ৬৭টি কবিতা। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮০। এছাড়া ‘দিন কেটে যায় ছন্দে’ বইটিও শুদ্ধপ্রকাশের ব্যানারে আমার প্রকাশিত প্রথম ছড়ার বই। শিশুতোষ এই বইটিতে মোট ছড়া রয়েছে ৫০টি। বইটির মোট পৃষ্ঠা ৬৪। বই দুইটি প্রকাশ করেছে ‘শুদ্ধপ্রকাশ’। প্রকাশক হিরোণ্ময় হিমাংশু। ‘শুদ্ধপ্রকাশ’ নতুন হলেও ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনী হিসেবে সবার নজর কেড়েছে।

ঝকঝকে লেমিনেটিং করা দুটি বইয়েরই প্রচ্ছদ করেছেন সবার পরিচিত ও প্রিয়মুখ প্রচ্ছদশিল্পী চারুপিন্টু। দুটি বইয়ের মূল্য রাখা হয়েছে ১৬০ টাকা করে। তবে বিশেষ ডিসকাউন্টে মেলায় ১২০ টাকায় পাওয়া যাবে। অমর একুশে গ্রন্থমেলার (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে) ৩৯৮ নম্বর ‘শুদ্ধপ্রকাশ’ স্টলে বই দুটি পাওয়া যাবে। এছাড়াও পাঠক রকমারি ডটকম থেকে ২৫ ভাগ ছাড়ে বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন।

গ্রন্থবদ্ধ লেখাগুলোর বিষয়বস্তু নিয়ে যদি বলেন…

হাসান রাজীব: জগৎ-সংসারের বাস্তবতা, ভাবরাজ্যের কল্পকাহিনি, নারী-পুরুষের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্যতার এক শৈল্পিক রসায়ন ‘অরফিয়াসের বীণা’ কাব্যগ্রন্থটি। ‘অরফিয়াসের বীণা’ মূলত প্রাচীন গ্রিসের প্রেম ও সৌন্দর্যের অনিন্দ্য সুন্দর দেব-দেবী নির্ভর একটি কবিতা। তা সত্ত্বেও কাব্যগ্রন্থটির প্রত্যেকটি কবিতা যেন দেবতা অরফিয়াসের বাঁশির সেই সম্মোহনী সুরের মূর্ছনা। পড়তে পড়তে পাঠক পৌঁছে যাবে কল্পরাজ্যের সৌধচূড়ায়। এছাড়াও মানুষ, সমাজ, জীবন ও মূল্যবোধ এবং বিশ্বাস-অবিশ্বাসের এক অভূতপূর্ব যোগসূত্র নির্মাণের প্রয়াস চালানো হয়েছে প্রায় এক দশক ধরে লেখা ‘অরফিয়াসের বীণা’ গ্রন্থটিতে।

এছাড়া ‘দিন কেটে যায় ছন্দে’ নামে ছড়ার বইটিতে প্রত্যেকটি ছড়া শিশু-কিশোরদের জন্য উপযোগী করে বাছায় করা হয়েছে। শিশু জন্মের পর থেকে প্রথমে শেখে পরিবার থেকে; এরপর প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে সে শিক্ষা নেয়। পরিবারের আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশের সমন্বয়ে শিশুর কল্পনা ও স্মরণশক্তির বাহন হিসেবে কাজ করবে ‘দিন কেটে যায় ছন্দে’ বইটি। ফুল, পাখি, লতা-পাতা, গাছ-গাছালি, স্বপ্নরাজ্য, রাজা-রানি, লাল-নীল পরী সবই এ বইটির উপজীব্য। শিশুর সুস্থ-সুন্দর মানসিক বিকাশে এক অনন্য প্রয়াস ‘দিন কেটে যায় ছন্দে’ বইটি।

আপনার বইয়ের পাঠক সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?

হাসান রাজীব: আসলে আমার বইয়ের সর্বপ্রথম পাঠক আমি নিজেই। একটা লেখা দাঁড় করানোর পরে সর্বপ্রথম আমি নিজেই সেটা আবৃত্তি করি। বিবেক যেটা সায় দেয় শুধুমাত্র সেটায় আলোর মুখ দেখে। এরপর রয়েছে মহামূল্যবান পাঠকদের ভালো লাগা না লাগার বিষয়। সেক্ষেত্রে লেখার ভালো-মন্দ বিচারের একমাত্র এবং চূড়ান্ত বিচারক পাঠক। সে রাজ্যের রাজা-প্রজা-সৈন্য-সামন্ত সবই পাঠক। লেখক সেখানে সামান্য জোগানদার মাত্র।

আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি পাঠকদের ভালো লাগার জন্য কিছু করতে। সব সময়ই চেষ্টা করেছি পাঠকের মহামূল্যবান সময়টুকুর সঠিক মূল্যায়ন করতে। জানি না কতটুকু পেরেছি। এর মাপকাঠির বিচারকও সেই পাঠকই। তাই আমার কাছে পাঠকের মূল্যায়ন এভারেস্টসম। তবে এক্ষেত্রে আমি অনেকটা ভাগ্যবান যে আমার প্রথম দুইটি বই-ই পাঠক মহলে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। পাঠক আসলে গতানুগতিক থেকে বেরিয়ে নতুনের অন্বেষণ করে। আর এই জায়গাটিতে আমি কিছুটা এগিয়ে যেতে পেরেছি বলে মনে হয়। আর এ জন্যই পাঠককে আরো একবার ধন্যবাদ।

তবে এক্ষেত্রে আরো একটা নাম না বললেই নয়, সেটা হলো প্রকাশক। শুদ্ধপ্রকাশ নামের নতুন এই প্রকাশনীটি ইতোমধ্যে দেশের প্রকাশনা জগতে বেশ শুনাম কুড়িয়েছে। শুদ্ধপ্রকাশের এগিয়ে যাওয়াটা যথেষ্ট ইতিবাচক এবং সম্ভাবনাময়। আমি তাদের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।

বছরের অন্য সময় প্রকাশ না করে মেলায় কেন?

হাসান রাজীব: আমাদের দেশে যে পরিমাণ বই প্রকাশ করা হয় তার সিংহভাগই আসলে মেলাকেন্দ্রিক। তাই মেলাকে বাদ দিয়ে অন্য সময় বই প্রকাশের আগ্রহ বোধ হয় অনেকেরই থাকে না। মেলা উপলক্ষে পাঠক ও লেখকের মধ্যে সুন্দর একটা বোঝাপড়া হয়। বলতে গেলে পাঠক-লেখকের সম্মিলন ঘটে এই মেলায়। তাই বই প্রকাশের জন্য উৎকৃষ্ট সময় হিসেবে আর সবার মতো মেলাকেই বেছে নেয়া।

সামগ্রিকভাবে মেলা সম্পর্কে আপনার ভাবনা জানতে চাই

হাসান রাজীব: আমরা আসলে ক্রমান্বয়ে সংস্কৃতিময় হয়ে উঠছি। সংস্কৃতিচর্চায় নিজেদের মনোনিবেশ করতে পারছি। কিন্তু এই মনোনিবেশটা এখন সার্বক্ষণিক হওয়া সময়ের দাবি। না হলে আমাদর বোধ হয় অন্যদের থেকে পিছিয়ে যাওয়াটাও অমূলক নয়। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চায় জাতি হিসেবে আমাদের বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।

একুশে বইমেলা এখন আমাদের জাতীয় উৎসব। শুধু লেখক-প্রকাশক-পাঠক নয়, এ মেলা এখন সবার। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এ মেলার সময় ও পরিধি আরো বাড়ানো প্রয়োজন। ফেব্রুয়ারি ছাড়াও বছরের অন্যান্য সময় জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ সাহিত্য মেলা এবং বইমেলার আয়োজন করা যেতে পারে। এছাড়া মেলাকে আরো পরিছন্ন ও পরিপাটি করা যেতে পারে। ছুটির দিন বাদে বইমেলা সাধারণত বিকেল থেকে বসে। আমি বলবো এসময় পুরো দিনটাই বইমেলার জন্য রাখা হোক। অন্যান্য মেলা যেমন বাণিজ্য মেলা যেভাবে হয়ে থাকে।

মেলা নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা

হাসান রাজীব: বইমেলা নিয়ে আমার যে অভিজ্ঞতা সেটাও দুটো অংশে বিভক্ত। প্রথমত পাঠক হিসেবে, দ্বিতীয়ত লেখক হিসেবে। জ্ঞানবুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই বইমেলায় যাচ্ছি। আমাদের দেশের ভালো ভালো লেখকের বই পড়ছি। পড়ছি বিদেশি লেখকের বইও। বয়সের সাথে সাথে পড়ার বইয়ের ধরনও পাল্টেছে। বিভিন্ন নামি-দামি লেখকের বই দেখছি, কিনছি, পড়ছি। সেটা একটা অভিজ্ঞতা। আর এবারই প্রথম মেলাতে আমার বই এসেছে, সেখানে আরেক অভিজ্ঞতা। পাঠকের হাতে নিজের লেখা বই তুলে দেয়ার অনুভূতিই অন্যরকম।

লেখালেখি চর্চার ক্ষেত্রে প্রেরণা বা প্রভাব কার কাছ থেকে বা কিভাবে?

হাসান রাজীব: ওই যে প্রথমেই বলেছি লেখালেখি চর্চার ক্ষেত্রে আমার প্রেরণা বা প্রভাব সর্বপ্রথম পরিবার থেকেই। আমার নানার দিক থেকেই বলি আর বাবার দিক থেকেই বলি একটা সাহিত্য আবহে আমি বড় হয়েছি। শৈশবে ঝিনাইদহের কলাবাগানে আমাদের বাসার পাশেই ছিল একটি লাইব্রেরি। লেখাপড়ার সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়টাতে আমি ওই লাইব্রেরিতেই পড়ে থাকতাম। বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে পড়তেই একসময় লেখালেখির সূত্রপাত। তৃতীয় শ্রেণিতে থাকাকালীন আমাদের স্কুলের দেয়াল পত্রিকায় আমার প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়।

আমাদের দেশে বইমেলার প্রয়োজনীয়তা কী? আপনার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বলুন

হাসান রাজীব: আমি মনে করি বাঙালি সাহিত্যপ্রেমী। সাহিত্য ছাড়া বাঙালির অস্তিত্ব কল্পনা করাও দূরুহ। আর আমাদের দেশে বইমেলা এখন বলতে গেলে সাহিত্যের একটা বড় অংশজুড়ে অবস্থান করছে। এখন যেন সাহিত্যের ধারক-বাহকও এই বইমেলা। সেক্ষেত্রে বইমেলা যে শুধু আমাদের প্রয়োজন তা নয়, অপরিহার্যও বলা যেতে পারে। দৈনন্দিন খাবারের জন্য যেমন আমাদের বাজারের যাওয়ার প্রয়োজন, তেমনি মনের খোরাকের জন্য এই বইমেলা আমাদের রসদ যুগিয়ে যাচ্ছে। বলতে গেলে বইমেলা বাঙালির প্রাণ। তাইতো আমরা ভালোবেসে এর নাম দিয়েছি প্রাণের মেলা।

প্রকাশকদের নিয়ে আপনার অভিমত কি?

হাসান রাজীব: প্রকাশকরাও তো চেষ্টা করছেন। কিন্তু ওই যে শুধু আবেগ দিয়ে তো পেট চলে না। নতুন একটা বই বাজারে ছাড়ার পর সেটা যদি একবারেই আনকোরা হাতের কোনো লেখা হয় তাহলে খরচ উঠানো এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকাশকদেরও অনেকটা উদারতার পরিচয় দিতে হয় বৈকি। না হলে নতুনরা কীভাবে উঠে আসবে। তবে এক্ষেত্রে সাধারণ পাঠকদের ভূমিকা সবার উপরে। মনে রাখতে হবে- বই কিনে কেউ দেওলিয়া হয় না।

কোন কোন ব্যাপারে মনঃক্ষুন্নতা আছে আপনার?

হাসান রাজীব: মনঃক্ষুন্নতার বিষয়ে বলতে গেলে বলতে হয় আমার কাছে দুটো বিষয় খুবই পিড়া দেয়। নতুন কোনো কিছু সদরে গ্রহণ করতে আমাদের কেমন যেন অনিহা। নতুন কিছু সহজে আমরা মেনে নিতে চাই না। অর্থাৎ মূল্যায়নটা নেই, অন্তত জীবদ্দশায়তো নয়ই। আরেকটি বিষয় হলো সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতা। নিজের কোনো স্বার্থ ছাড়া এটা একেবারেই উঠে গেছে। নিজেদের স্বার্থ ও প্রশংসা ছাড়া অন্যকে প্রশংসাটুকুও করতে যেন আমরা ভুলে গেছি। আর পাশের কাউকে তো আমরা একেবারেই সহ্য করতে পারি না। একজন অচেনা অজানা লোককে উঠানোর জন্য সহযোগিতা করলেও পাশের ও নিকট লোকদের একদমই সহযোগিতা করতে চাই না আমরা। এই মনোবৃত্তি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত। মূলত মানুষ বিশেষ প্রয়োজনে সর্বপ্রথম তার আশপাশের ও পরিচিতদের সহযোগিতা বেশি আশা করে।

লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

হাসান রাজীব: লেখালেখি নিয়ে ভবিষ্যতে খুব বেশি পরিকল্পনা নেই। শুধু একটাই পরিকল্পনা, আর তাহলো যতদিন সম্ভব লেখালেখিটা চালিয়ে যেতে চাই এবং সবসময় পাঠকের সঙ্গেই থাকতে চাই।
…………………..


oranjee