ঢাকা, সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

কবিতার ভাষা তো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না : অথির চক্রবর্তী

গ্লোবালটিভিবিডি ১:৪৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯

কবি অথির চক্রবর্তী। জন্ম ১১ জুলাই, ১৯৮২, মতলব, চাঁদপুর। বেড়ে ওঠা সিলেট, রাঙামাটি, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জায়গায়। লেখালেখির হাতেখড়ি কৈশোর থেকেই। মূলত কবিতা লেখক। এছাড়াও সাহিত্য সমালোচনা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, শিশুসাহিত্য, গীতিকবিতা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে কলম সক্রিয়। দেশের প্রধান সব দৈনিকগুলোর পাশাপাশি ছোট কাগজগুলোতেও লিখে থাকেন।

সাহিত্যে এলেন কেন এবং কিভাবে?
অথির: সাহিত্য মূলত ভালোবাসার গহনকুসুম বন। এক অদ্ভুত ভালোবাসায় তাড়িত হয়েই কবিতা বা সাহিত্যের এই শিল্পযাত্রায় সামিল হয়েছি আমি। শুরু থেকেই প্রকৃতি আমার সতীর্থ। নদী আমাকে তার ভাষা দিয়েছে। পাখি দিয়েছে ছন্দ। পাহাড় দিয়েছে গভীর ধ্যানগ্রস্ততা। এইসবই আমাকে নিজের সঙ্গে নিজেকে মুখোমুখি করিয়েছে। জীবনকে তাই বিভিন্নভাবে দেখতে পারছি। এটা গেল একটা দিক। আর ছাপাছাপির ব্যাপারটা হলো আরেক দিক। নিজেকে তৈরি করার পরই এই ছাপাছাপির ব্যাপারটা এল। আমি তখন আমাদের মফস্বল শহর নাসিরনগরে থাকি। ওখানে তখন কিছু নতুন নতুন পত্রিকা বেরোচ্ছে, সেগুলোর মন আকুল করা গন্ধ! এই ব্যাপারগুলো আমাকে উদ্বুদ্ধ করত। আমি সেগুলো সংগ্রহ করে পড়তাম। এসএসসির চৌকাঠ পেরোনোর আগেই পড়া হয়ে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ, সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ বসু। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ছাড়াও আরো অনেকের লেখাই। তো এই পাঠটুকু ছিল সম্বল। তারপর একদিন সাহস করে মনের কথাগুলোই গুছিয়ে লিখে ফেলি। সেই প্রথম লেখা কবিতা ছাপাও হয়ে গেল একদিন...তারপর আর থেমে থাকিনি।

মেলায় এবার কী বই আসছে?
অথির: মেলায় এবার আসছে দুটো বই। একটি কবিতার। নাম ‘ব্যাকুলতাকালীন ছুটি’। গত কয়েক বছরে লেখা কবিতাগুলো নিয়েই এই বই। আর আরেকটি শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ বেরোচ্ছে ‘রাজা হাতির ঘণ্টা বাজে’ নামে।

নতুন বই সম্পর্কে বলুন
অথির: ‘ব্যাকুলতাকালীন ছুটি’ কবিতার বইটি গত বছর বেরোবার কথা থাকলেও যেকোনো কারণেই হোক আর বের হয়নি। কবিতা নিয়ে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে বইটিতে। মাটিলগ্নও থাকার চেষ্টা করেছি আমি। বিষয়-প্রকরণে আমার প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই ‘কোকিলের রাগত স্বর’ থেকে যতদূর সম্ভব সরে গেছি। পাঠক একদম নতুন কিছু কবিতা পাবেন বইটিতে। অনুভূতিসঞ্চারী এইসব কবিতাগুলোতে আছে জীবনের দিকেই পক্ষপাত। আর শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ ‘রাজা হাতির ঘণ্টা বাজে’ বইটিতে থাকছে মোট সাতটি গল্প। শিশুদের কল্পনাশক্তিকে উসকে দিতে গল্পগুলো লেখা। গল্পগুলোর বিষয়বস্তু একটি থেকে আরেকটি সম্পূর্ণ আলাদা। নির্মল্য হাস্যরসে ভরা কয়েকটি গল্পও আছে এতে। আমরা যেমন বিস্তৃত সবুজ মাঠ, খোলা আকাশ, পাহাড়, নদী দেখে বড় হয়েছি, এই ইট-কাঠের শহরে তা কল্পনাও করা যায় না তখনকার জীবন। নতুন প্রজন্মের শিশুদের কল্পনারাজ্য বিস্তৃত হবে কী করে? কিন্তু একজন গল্পকার বা লেখক গল্পে সেই কল্পনা বুনে দেওয়ার শক্তি রাখে, আমি তাই করেছি।

গ্রন্থবদ্ধ লেখাগুলোর বিষয়বস্তু নিয়ে যদি বলেন…
অথির: কবিতার বইটিতে জীবনের একরকম অনুসন্ধান রয়েছে। যা চোখে দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়। শিশুদের মনোজগৎ নিয়ে কাজ করা অনেক কঠিন। কারণ তাদের মনে অনেক প্রশ্ন। সেদিকে থেকে যদি বলি, ‘রাজা হাতির ঘণ্টা বাজে’ শিশুদের মনোজগতে প্রবেশের এক গোপন দরোজা।

আপনার প্রবন্ধ/কবিতা/গল্প বা উপন্যাসের পাঠক সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি
অথির: আমার লেখার যারা পাঠক, আমি বলব তারা নতুন পাঠক। বয়সের হিসেবে নয় চিন্তায়। কারণ ভাষা বদল একমাত্র কবিদের হাতেই। তারপর তা গদ্যে বা প্রবন্ধে গিয়ে মাত্রা খুঁজে পায়। রবীন্দ্রনাথ কিছু ফুলের নামকরণ করেছেন নিজের মতো করেই। এরমধ্যে একটি ফুলের নাম রেখেছিলেন ‘বাগানবিলাস’। এই ভাষাবদলের চমৎকারিত্ব যারা গ্রহণ করেন তারা সব নতুন পাঠক। আর কবিতার ভাষা তো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। জাহাজের কম্পাসের মতো তারও দিক বদল হয়। আমার কাজ তো লেখা পর্যন্তই শেষ। কিছু পাঠক তো আমার হয়েছেই। যারা আমার ফর্মকে গ্রহণ করেছেন। আমার ভাষাকে গ্রহণ করেছেন। সেটা আমার জন্য আনন্দের।

বছরের অন্য সময় প্রকাশ না করে মেলায় কেন?
অথির: ঈদ, পুজোর মতো বইমেলাও একটি সর্বজনীন ব্যাপার এখানে। সারাবছর যত বই বিক্রি হয় না, মাসব্যাপী মেলাতে তারচে’ অনেক বেশি বিক্রি হয়। প্রচুর পাঠক সমাগমের কারণেই তা হয়। বইকে ঘিরে পাঠক- লেখকের এই যে মেলবন্ধন সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। আমিও চাই এরকম উৎসবমুখর হাওয়াতেই আমার বইটি বের হোক। যাতে অনেক বেশি পাঠকের হাতে আমার বইটি পৌঁছাতে পারে। কারণ বই তো পাঠকের জন্যই লেখা। বই পাঠকের হাতে পৌঁছাতে মেলার কোনো জুড়ি নেই। বসন্তের আগমনীবার্তাও এই মেলার আরেক পাওনা। হালকা শীতের আমেজে কোকিলের সুরেলা আওয়াজ, পাতাঝরার মূর্ছনা এই সবকিছু মিলিয়ে মনে হয় এটা আসলেই বইমেলার মতো একটি চমৎকার আয়োজনের ঋতুও বটে।

সামগ্রিকভাবে মেলা সম্পর্কে আপনার ভাবনা জানতে চাই
অথির: বইমেলা শুরু হয়েছিল মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহার হাত ধরেই। তিনিই প্রথম চটের ছালা বিছিয়ে বাংলা একাডেমিতে বইমেলার প্রচলন করেন। সেই ইতিহাস অনেকেরই জানা। এখন অনেক প্রকাশক। অনেক লেখক। প্রতি বছর বইমেলা হচ্ছে। শহিদদের স্মরণে মূলত এই বইমেলার শুরুটা হয়েছিল। তাই এর যেমন ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি পাঠক সৃষ্টিতেও এর ভূমিকাকে গৌণ করে দেখারও কোনো সুযোগ নেই। এখন প্রকাশক ও লেখক বেশি হয়ে যাওয়াতে বইয়ের মান ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না কখনো কখনো। মননশীল ও সৃজনশীল বইয়ের তফাৎটাও অনেকে বুঝেন না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বইমেলা বিশাল জনরুচির চাহিদা মেটাবে না জাতির মানসিক গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে? নির্মল বিনোদনের জন্য বই একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। জনরুচির চাহিদার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বইকে মানসম্মত করে তোলা। বইমেলার ভেতর যেহেতু একসঙ্গে অজ¯্র পাঠক সমাবেশ হচ্ছে। তাই বইমেলা এর সূচনাবিন্দু। এখান থেকে বই সারা বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে ছোট-বড় অনেকের ওপর। বইমেলাকে ঘিরে বাংলা একাডেমিও গ্রহণ করতে পারে আরো নতুন নতুন উদ্যোগ। যাতে ভালো বইগুলোকে সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। আর পাঠকের বই পড়ার স্পৃহা আরো বর্ধিত হয়। মেলায় আসা শিশুদের জন্যও একাডেমি কর্তৃপক্ষ করতে পারে চিত্তআকর্ষক নানারকম ইভেন্ট। বই দিয়েও এই রকম ইভেন্ট করা যেতে পারে। যাতে বইয়ের ব্যাপারটা তাদের শিশু মনস্তত্বে ঢুকে যেতে পারে।

মেলা নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা
অথির: আমার প্রথম বই ঐতিহ্য থেকে বেরোল, ২০১৩ সালের দিকে। সেটা ছিল আমার জন্য এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। এর আগে অন্যদের বই বেরোত আমি যেতাম। সেবার নিজের বইয়ের জন্য গিয়েছি!

লেখালেখি চর্চার ক্ষেত্রে প্রেরণা বা প্রভাব কার কাছ থেকে বা কিভাবে
অথির: ছোটবেলা থেকেই আমাদের বাসায় প্রচুর বই দেখে বড় হয়েছি। বই আর আমি কখনো কখনো এক আত্মা হয়ে যেতাম। আমি ছোট থাকতে তেমন খেলাধুলা করিনি। বই নিয়েই পড়ে থাকতাম। তো পরে বুঝলাম যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে। বইয়ের জগৎ থেকে আমার আর বেরোনোর পথ নেই। পড়তে পড়তেই হঠাৎ লিখতে বসা...আমার প্রেরণাদাতা মূলত বই।

আমাদের দেশে বইমেলার প্রয়োজনীয়তা কী? আপনার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বলুন…
অথির: বইমেলার প্রয়োজনীয়তা শুধু মাসব্যাপী নয় সারাবছরের। স্কুলে স্কুলে, কলেজে কলেজে এই মেলাকে নিয়ে যেতে হবে। পাঠ্যপুস্তকের চাপ কমিয়ে আউট বইও খুদে পাঠকদের হাতে তুলে দিতে হবে। মনীষীদের আত্মজীবনীও পাঠ্যপুস্তকের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পাঠ্যপুস্তক বেসিক নলেজের ঘাটতি পূরণ করে। আর একজন মনীষীর আত্মজীবনী তার সমগ্র জীবনই তুলে দেয় পাঠকের হাতে। আর সেই জীবনে কী নেই? অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, বিশ্বাস, ভালোবাসা, চেষ্টা, জয়-পরাজয়! এগুলোও জ্ঞানের অন্য প্রকাশ। বইমেলাকে সামগ্রিক রূপ দিতে একুশে বইমেলার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এখন অবশ্য সারাবছর মেলার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ বইমেলাও কেউ কেউ করছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যা অনেক আগে থেকে করে আসছে। এগুলো অবশ্যই আমাদের একুশে বইমেলাকেই প্রতিনিধিত্ব করছে।

প্রকাশকদের নিয়ে আপনার অভিমত কি?
অথির: প্রকাশক দুই ধরনের। এক শ্রেণি আছেন ভালো পা-ুলিপির সন্ধানে থাকেন। এবং ভালো পা-ুলিপি পেলেই বই করেন। আর আরেক শ্রেণি আছেন, পা-লিপির তুল্যমূল্য বিচারে না গিয়ে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বই করেন। আমি মনে করি প্রকাশকের ব্যবসার পাশাপাশি কিছু দায়ও বর্তায়। নইলে এত ব্যবসা থাকতে তিনি বই ব্যবসায় আসবেন কেন? এটা কি নেহাত ব্যবসা, না আরো কিছুও এর সঙ্গে যুক্ত? হয়তো ঘাঁটলে দেখা যাবে, এখন যিনি প্রকাশক তিনি কবিতা বা সাহিত্যের প্রতি একরকম ভালো লাগা থেকেই এই পুস্তক-ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। বা অতীতে তিনিও হয়তো কবিতা লিখেছেন বা লিখছেন...এই ব্যাপারগুলো তো আছেই। প্রকাশক ব্যবসা করবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মোটা বইয়ের থেকে যে লাভটুকু আসে তা থেকে একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণের প্রথম বা দ্বিতীয় বইটি তিনি অনায়াসে করে দিতে পারেন। এছাড়া প্রত্যেকটি ভালো প্রকাশনার স্পষ্ট কিছু নীতিমালা থাকা দরকার লেখকদের বই প্রকাশনাসংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে।

কোন কোন ব্যাপারে মনঃক্ষুন্নতা আছে আপনার?
অথির: বইমেলা চলাকালীন বাংলা একাডেমির মূল মঞ্চে সাহিত্যসম্পর্কিত যেসব সেশন হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই দুঃখজনক। দেখা যায় বাংলা একাডেমিতে চাকুরিরত লেখকরাই জায়গা দখল করে বসে থাকেন। আর বাইরে থেকে যারা আসেন তারাও মনে হয় বাংলা একাডেমিরই বাইরের আরেক পার্ট। এখানেও ব্যাপারগুলো স্পষ্ট নয় আমার কাছে। বাংলা একাডেমি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের উচিত মূল ধারার কবি ও লেখকদের আলাদা সূচি প্রণয়ন করা। এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কারণ বছরের এই একটা মাস প্রকৃত লেখকদের মূল্যায়নের পাদপ্রদীপে আনা প্রয়োজন।

লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?
অথির: কবিতা বা গল্পে প্রকৃত অর্থেই ভালো কিছু কাজ করে যেতে চাই। হাওড়ের জনপদ নিয়ে দীর্ঘ উপন্যাস লেখার ইচ্ছে আছে। কবে শুরু করতে পারব জানি না। ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি চলছে।


oranjee