ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ | ২ কার্তিক ১৪২৬

 
 
 
 

চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ৯৫তম জন্মবার্ষিকী আজ

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:৫৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০১৯

ফাইল ছবি

বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ৯৫ তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯২৪ সালের এই দিনে নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি।

শিল্পী সুলতানের জন্মদিন উপলক্ষে এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন ও নড়াইল জেলা প্রশাসনের আয়োজনে কোরআনখানি, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(সার্বিক) মোঃ ইয়ারুল ইসলাম, সহকারী কমিশনার(ভূমি) মোঃ আজিম উদ্দিনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

১৯২৪ সালের ১০ আগষ্ট তৎকালীন মহকুমা শহর নড়াইলের চিত্রা নদীর পাশে সবুজ শ্যামল ছায়া ঘেরা, পাখির কলকাকলীতে ভরা মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন শিল্পী এস এম সুলতান। তার পিতা মোঃ মেছের আলি মাতা মোছাঃ মাজু বিবি। চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে পিতা মাতা আদর করে নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া।

চিত্রশিল্পী এস, এম, সুলতানের ৭০ বছরের বোহেমিয়ান জীবনে তিনি তুলির আঁচড়ে দেশ, মাটি, মাটির গন্ধ আর ঘামে ভেজা মেহনতী মানুষের সাথে নিজেকে একাকার করে সৃষ্টি করেছেন ‘পাট কাটা’, ‘ধানকাটা’, ‘ধান ঝাড়া’, ‘জলকে চলা’, ‘চর দখল’, ‘গ্রামের খাল’, ‘মৎস শিকার’, ‘গ্রামের দুপুর’, ‘নদী পারা পার’, ‘ধান মাড়াই’, ‘জমি কর্ষনে যাত্রা’, ‘মাছ ধরা’, ‘নদীর ঘাটে’, ‘ধান ভানা’, ‘গুন টানা’, ‘ফসল কাটার ক্ষণে’, ‘শরতের গ্রামীন জীবন’, ‘শাপলা তোলা’ মত বিখ্যাত ছবি।

১৯৫০ সালে ইউরোপ সফরের সময় যৌথ প্রদর্শনীতে তার ছবি সমকালনী বিশ্ববিখ্যাত চিত্র শিল্পী পাবলো পিকাসো, ডুফি, সালভেদর দালি, পলক্লী, কনেট, মাতিসের ছবির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। সুলতানই একমাত্র এশিয়ান শিল্পী যার ছবি এসব শিল্পীদের ছবির সঙ্গে একত্রে প্রদর্শিত হয়েছে।

লাল মিয়ার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ১৯২৮ সালে রুপগঞ্জ আশ্রম স্কুলে ভর্তির মাধ্যমে। ১৯৩৩ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যয়ের পুত্র শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্কুল পরিদর্শনে আসেন। এ সময় লাল মিয়া তার একটি সুন্দর ছবি আঁকলে তৎকালীন জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়সহ সকলে মুগ্ধ হন। শুরু হয় শিল্পী লালের রং তুলি হাতে নতুন জীবন।

শিল্পী হওয়ার মনোবাসনায় লাল মিয়া পাড়ি জমান কলকাতার উদ্দেশ্যে। কলকাতার কাশিপুরে নড়াইলের জমিদার বাড়িতে থেকে জমিদার পুত্র অরুন রায়ের সহযোগিতায় কলকাতার আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন।

পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকায় ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হস্তক্ষেপে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান তিনি।

সোহরাওয়ার্দী লাল মিয়াকে তার বাসায় থাকার সুযোগ করে দেন। এ সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাতা তার নাম রাখেন শেখ মোঃ সুলতান।

১৯৪৩ সালে সুলতান খাকসার আন্দোলন নামে একটি সেবা মূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। শিক্ষাজীবন অসমাপ্ত রেখেই ১৯৪৪ সালে তিনি ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন।

কাশ্মীরের পাহাড়ে কিছুদিন একদল উপজাতিদের সঙ্গে বসবাস করেন। ১৯৪৬ সালে কাশ্মীর থেকে চলে যান সিমলায়, সেখানে তার প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়। এই প্রদশর্নী তার শিল্পী জীবনের প্রথম স্বীকৃতি।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের লাহোরে ও পরে করাচিতে অবস্থান করেন। এসময় নাগী, চুগতাই, শাকে আলী, শেখ আহম্মেদসহ অনেক পন্ডিত ব্যাক্তিদের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। ইউরোপ ও আমেরিকা জয় করে মহান এই শিল্পী ১৯৫৩ সালে দেশে ফিরে আসেন।

কিছুদিন ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্রাবাসে অবস্থান করে ফিরে আসেন মাতৃভূমি নড়াইলে। ১৯৫৫ সালে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার চাচুড়ি-পুরুলিয়ায় নন্দন কানন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

শিল্পী ১৯৫৬ সালে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের সাথে কয়েকদিন আবস্থান করেন।

১৯৬০ সালে যশোরের চাঁচড়ার জমিদার বাড়ি কিছু কাল অবস্থান করেন। ১৯৬৫ সালে সবার অগচরে পুনরায় পশ্চিম পাকিস্তানে গমন করেন।

হারিয়ে যাওয়া লাল মিয়াকে ১৯৬৭ সালে নড়াইলের অদুরে এক গ্রামে খুঁজে পাওয়া যায়। যশোরের তৎকলীন জেলা প্রশাসক এনাম আহম্মেদ চৌধুরী তাকে যশোর নিয়ে আসেন।

১৯৬৮ সালে যশোর-খুলনা ক্লাবে তার একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। জেলা প্রশাসক এনাম আহম্মেদ চৌধুরীর উদ্যোগে ১৯৬৯ সালের ১০ জুলাই সুলতানের মাছিমদিয়ার বাড়িতে দি ইনস্টিটিউট অফ ফাইন আর্টস উদ্বোধন করেন।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শিল্পী জেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে যুদ্ধের ছবি আঁকেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিল্পী নিজ শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। প্রতিদিন রাতে একটা ঝোলা ব্যাগ কাঁধে তিনি কাটিয়েছেন শহরের বিভিন্ন বাড়িতে। এ সময় তার সঙ্গে থাকতো আড়বাঁশি, আর কয়েকটি পোষা বেজি।

১৯৭৬ সালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে তার একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। মুলত, এই প্রদশর্নীর মাধ্যমে এ দেশের সুশীল সমাজের তার নতুন ভাবে পরিচয় ঘটে।

কালোত্তীর্ণ এই চিত্রশিল্পী ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্স আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়।

১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শিল্পী সুলতান মৃত্যুবরণ করেন।

এএইচ/এমএস


oranjee