ঢাকা, সোমবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

‘বিষাদ সিন্ধু’র স্রষ্টা মীর মশাররফ হোসেনের আজ ১৭২তম জন্মবার্ষিকী

গ্লোবালটিভিবিডি ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

ছবি সংগৃহীত

কাজী সাইফুল, কুষ্টিয়া: কালজয়ী সাহিত্যিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক, ‘বিষাদ সিন্ধু’র অমর স্রষ্টা মীর মশাররফ হোসেনের ১৭২তম জন্মবার্ষিকী আজ।

তিনি ১৮৪৭ সালের এই দিনে (১৩ নভেম্বর) তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশ) খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের লাহিনীপাড়া গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মীর মোয়াজ্জেম হোসেন এবং মাতার নাম দৌলতুন্নেছা।

তিনি ছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান গদ্যশিল্পী ও বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ। কারবালার যুদ্ধকে উপজীব্য করে রচিত বিষাদ সিন্ধু তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যকর্ম।

তার স্কুল জীবন কেটেছে প্রথমে কুষ্টিয়ায়, পরে পদমদী এবং শেষে কৃষ্ণনগর শহরে। জগমোহন নন্দীর পাঠশালা, কুমারখালীর ইংলিশ স্কুল, পদমদী নবাব স্কুল, কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন বলে তার আত্নজীবনীতে উল্লেখ আছে। তবে তার কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয় ফরিদপুরের নবাব এস্টেটে চাকরি করে। তিনি কিছুকাল কলকাতায় বসবাস করেন।

মীর মশাররফ হোসেন তার বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কাব্য ও প্রবন্ধ রচনা করে আধুনিক যুগে মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্যে সমৃদ্ধ ধারার প্রবর্তন করেন। এই পর্যন্ত মশাররফ হোসেনের মোট ৩৭টি বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে।

মীর মশাররফ হোসেন লিখিত গ্রন্থগুলো হলো-
১. রত্নবতী (উপন্যাস ১৮৭৩)
২. বসন্ত কুমারী (নাটক ১৮৭৩)
৩. জমিদার দর্পণ (নাটক ১৮৬৯)
৪. গড়াই ব্রীজ বা গৌড়ী সেতু (কবিতা গ্রন্থ ১৮৭৩)
৫. এর উপায় কি (প্রহসন ১৮৭৬)
৬. বিষাদ-সিন্ধু (ঐতিহাসিক উপন্যাস ১৮৮৫-৯১)
৭. সঙ্গীত লহরী (১৮৮৭)
৮. গো-জীবন (প্রবন্ধ ১৮৮৯)
৯. বেহুলা গীতাভিনয় (গীতিনাট্য ১৮৮৯)
১০. উদাসীন পথিকের মনের কথা (জীবনী ১৮৯৯)
১১. গাজী মিয়ার বস্তানী (রম্যরচনা ১৮৯৯)
১২. মৌলুদ শরীফ (গদ্যে-পদ্যে লিখিত ধর্মীয় গ্রন্থ ১৯০০)
১৩. মুসলমানের বাঙ্গালা শিক্ষা (ছাত্র পাঠ্য ১ম ভাগ ১৯০৩ এবং ২য় ভাগ ১৯০৮)
১৪. বিবি খোদেজার বিবাহ (কাব্য ১৯০৫)
১৫. হযরত ওমরের ধর্ম জীবন লাভ (কাব্য ১৯০৫)
১৬. হযরত বেলালের জীবনী (প্রবন্ধ ১৯০৫)
১৭. হযরত আমীর হামজার ধর্ম জীবন লাভ (কাব্য ১৯০৫)
১৮. মদিনার গৌরব (কাব্য ১৯০৬)
১৯. মোশ্লেম বীরত্ব (কাব্য ১৯০৭)
২০. এসলামের জয় (প্রবন্ধ গ্রন্থ ১৯০৮)
২১. আমার জীবনী (আত্মজীবনী ১৯০৮-১০)
২২. বাজীমাত (কাব্য ১৯০৮)
২৩. হযরত ইউসোফ (প্রবন্ধ গ্রন্থ ১৯০৮)
২৪. খোতবা বা ঈদুল ফিতর (কাব্য ১৯০৮)
২৫. বিবি কুলসুম (জীবনী ১৯১০)।

এছাড়াও মীর মশাররফ হোসেনের লেখা আরও ১২টি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়। এই গ্রন্থগুলো হলো-
২৬. ভাই ভাই এইত চাই (প্রহসন ১৮৯৯)
২৭. ফাঁস কাগজ (প্রহসন ১৮৯৯)
২৮. এ কি! (প্রহসন ১৮৯৯)
২৯. টালা অবিনয় (প্রহসন ১৮৯৯)
৩০. পঞ্চনারী (কাব্য)
৩১. প্রেম পারিজাত (কাব্য)
৩২. বাঁধাখাতা (উপন্যাস ১৮৯৯)
৩৩. নিয়তি কি অবনতি (উপন্যাস ১৮৯৯)
৩৪. রাজিয়া খাতুন (উপন্যাস ১৮৯৯)
৩৫. তহমিনা (উপন্যাস ১৮৯৯)
৩৬. গাজী মিয়ার গুলি (রম্যরচনা)
৩৭. বৃহত হীরক খনি (শিশু পাঠ)।

মীর মশাররফ প্রথম জীবন থেকেই ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন। ভাষা ব্যবহারে তিনি যে উদার ও মুক্তমনের পরিচয় দিয়েছেন, তা ছিল সেই যুগে দুর্লভ। ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে আরবি-ফারসি শব্দ যথাসম্ভব বর্জন করে তিনি সংস্কৃতজ বাংলা শব্দ ব্যবহার করেছেন।

বাঙালি মুসলমানের মধ্যে মীর মশাররফকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রবক্তা বলে স্মরণ করা প্রয়োজন। উত্তরকালে তিনি তার পরিচালিত পাক্ষিক পত্রিকা ‘হিতকরী’ (১৮৯০) এবং সাহিত্যচর্চায় দেশ, ভাষাপ্রীতি ও বাঙালিবোধ উপলব্ধির ক্ষেত্রে আরও প্রাজ্ঞ ও পরিণত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, বোধ-বিশ্বাস-চেতনায় নিজেকে আরও সুদৃঢ় করেছেন।

মীর মশাররফ হোসেন মাত্র আঠারো বছরে বয়সে তার পিতার বন্ধুর কন্যা আজিজন্নেসার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ১৯১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর দেলদুয়ার এস্টেটে ম্যানেজার থাকাকালেই মৃত্যুবরণ করেন। তাকে রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দির পদমদীতে দাফন করা হয়।

এএইচ

 

 


oranjee