ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

 
 
 
 

অবহেলায় বিলুপ্তপ্রায় একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আজিজুর রহমানের স্মৃতি

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:৩২ অপরাহ্ণ, মে ২৭, ২০১৯

ছবি সংগৃহীত

কাজী সাইফুল, কুষ্টিয়া:

“মানুষের মনে দিওনা আঘাত 

সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে”

“আমি রূপনগরের রাজকন্যা
রূপের জাদু এনেছি”

“তারা ভরা রাতে
তোমার কথা যে মনে পরে বেদনায়”

এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের রচয়িতা কবি আজিজুর রহমান। তিনি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার গড়াই নদীর তীর ঘেঁষা হাটশ হরিপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কবিকে ১৯৭৯ সালে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সর্ব্বোচ্চ বেসমরিক সন্মাননা পদকে (একুশে পদক) ভূষিত করা হয়। কিন্তু গভীর দুঃখ পরিতাপের বিষয়, এমন একজন গুণী রাষ্ট্রীয় সর্ব্বোচ্চ বেসমরিক সন্মাননা পদক প্রাপ্ত সাহিত্যিক, গীতিকার বহু প্রতিভার ধারক বাহক কবি আজিজুর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও স্মৃতি চারণে আজও নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে তার বাস্তুভিটা ও সমাধি চত্বর। হারানোর পথে তার সমাধিস্থলসহ কবির সকল স্মৃতিময় স্থান। এমনকি কবির জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকীর মতো দিবসগুলো চলে যায় নীরবেই রাষ্ট্রীয় কোনো বিশেষ আয়োজন ছাড়া।

গুণী এই মানুষের জন্মবার্ষিকী এবং মৃত্যুবার্ষিকী প্রতি বছর নীরবেই চলে যায়, স্থানীয় আজিজুর রহমান সাহিত্য পরিষদ ছোট পরিসরে স্থানীয়ভাবে বিগত কয়েক বছর ধরে জন্মবার্ষিকী এবং মৃত্যুবার্ষিকী পালন করলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে নিয়ে বিশেষ কোনো আনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় না। এটা কবির প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শনের শামিল বলে মনে করেন তাঁর ভক্তরা।

কবি আজিজুর রহমান ১৯১৪ সালের ১৮ অক্টোবর কারো কারো মতে ১৮ জানুয়ারি ১৯১৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন কিন্তু কবির চাকরি বইয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কবি ১৯২২ সালের ১৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বশির উদ্দিন প্রামানিক, মাতার নাম সবুরুননেছা।

কবি আজিজুর রহমান ১৯২৭ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে পিতাকে হারিয়ে তিনি অসহায় হয়ে পড়েন। পারিবারিক সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আর লেখাপড়া করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেও প্রবল আগ্রহ ও ইচ্ছা শক্তির কারণে বিভিন্ন বইপত্র সংগ্রহ করে বাড়িতেই পড়াশোনা করে তিনি একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলেন। ১৯৩১ সালে ১৭ বছর বয়সে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ফুলহরি গ্রামের ফজিলাতুন নেছাকে বিয়ে করেন। কবি ৪ কন্যা ও ৩ পুত্র সন্তানের জনক।

সাহিত্যচর্চা শুরু করার আগে নাট্য দলের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। অভিনয়ের প্রতি তার উৎসাহ ছিল প্রচন্ড । সে কারণেই তিনি গড়ে তোলেন একটি নাট্যদল। তার প্রতিষ্ঠিত নাট্যদলটি শিলাইদহের বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়িতে নাটক মঞ্চস্থ করত। তার নাট্যদলের জন্য সে সময় কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কবি আজিজুর রহমান খ্যাতি অর্জন করেন। সে সময়ের বিশিষ্ট অভিনেতা উপেশ ঠাকুর, ধীরেন দত্তসহ, বিভিন্ন নামিদামি অভিনেতারা তার নাট্যদলে অংশগ্রহণ করেন। কবি পঁচিশশতের অধিক গান রচনা করে গেছেন যেটা মুসলিম গীতিকার হিসেবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের পরের স্থান।

তিনি শুধু গান, কবিতা, নাটকের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। গল্প উপন্যাস রচনায়ও সমান পারদর্শী ছিলেন তিনি। অনেক গল্প ও উপন্যাস রচনা করেছেন সেগুলো পাঠক মহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়। কবির লেখা উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো- আজাদীর বীর সেনানী কুমারখালীর কাজী মিয়াজান, ছুটির দিনে, এই দেশ এই মাটি, উপলক্ষের গান। এছাড়াও তিনি অনুবাদও করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনুবাদ গ্রন্থ হচ্ছে ডাইনোসরের রাজ্যে, জীবজন্তুর কথা। কবি আজিজুর রহমান সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৩৪ সালে তিনি তার দাদা চাঁদ প্রামানিকের নামে নিজ গ্রাম হাটশ হরিপুরে গড়ে তোলেন বই সমৃদ্ধ ‘চাঁদ স্মৃতি পাঠাগার’।

তিনি তিন শতাধিক কবিতা রচনা করেছেন। এসব কবিতা নবযুগ, নবশক্তি, আনন্দবাজার পত্রিকা, সওগাত, মোহাম্মাদী, আজাদ, বুলবুল পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতো। ১৯৪৫ সালে তিনি কুষ্টিয়া ফুড কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। ১৯৫০ সালে তিনি হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, কুষ্টিয়া জেলা বোর্ড ও ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্যও হয়েছিলেন।

পরে তিনি নিজের প্রতিভা বিকাশের জন্য ১৯৫৪ সালে ঢাকায় চলে যান এবং সেখানে গিয়ে একই বছরে (১৯৫৪ সালে) তিনি বাংলাদেশ বেতারে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতারেই কর্মরত ছিলেন। কবি আজিজুর রহমান সাংবাদিকতায় সাথেও যুক্ত ছিলেন । দৈনিক পয়গম পত্রিকায় ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক ছিলেন। তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত কিশোর মাসিক ‘আলপনী’র সম্পাদক ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি তৎকালীন মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। কবি আজিজুর রহমানই প্রথম তার জন্মস্থান কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস রচনায় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কুষ্টিয়ার ইতিহাসের বহু মূল্যবান তথ্য উপাত্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের বিষয়, তিনি তার সেই স্বপ্ন কুষ্টিয়ার ইতিহাস রচনা সম্পন্ন করার পূর্বেই মৃত্যু বরণ করেন।

বাংলাদেশের বিখ্যাত সুরকাররা আজিজুর রহমানের গানে যেমন সুর দিয়েছেন তেমন তার গানে কন্ঠ দিয়েছেন বাংলাদেশের সেই সময়ের খ্যাতনামা বেশির ভাগ নামিদামী শিল্পীরা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অসংখ্য জনপ্রিয় গান রচনা করেছেন তিনি। তার লেখা জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে,মনে পড়ে বেদনায়, আকাশের ঐ মিটি মিটি তারার সাথে কইবো কথা, নাই বা তুমি এলে, মনরে এই ভবের নাট্যশালায়, মানুষ চেনা দায়, কারো মনে তুমি দিও না আঘাত, সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে, আমি রূপনগরের রাজকন্যা, রূপের জাদু এনেছি, এই সুন্দর পৃথিবীতে, এই রাত বলে ওগো তুমি আমার, ওই চাঁদ বলে ওগো তুমি আমার।

জানা যায়, কবি আজিজুর রহমান বেঁচে থাকতে যা কিছু রচনা করেছেন তার অধিকাংশই বই আকারে লিপিবদ্ধ হয়নি এবং আজও অনেক কিছুই অপ্রকাশিত রয়েছে, যেটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। কবি আজিজুর রহমানের অপ্রাকাশিত পাণ্ডুলিপি যদি প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে তার প্রতি সামান্য হলেও সম্মান প্রদর্শন করা হবে। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই লেখকের প্রতি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে শুধু চরম অসম্মান অবহেলাই প্রদর্শন করা হয়েছে। বাংলাদেশের সাহিত্য ও সঙ্গীতের জন্য কবি আজিজুর রহমানের অবদান অবিস্মরণীয়। কিন্তু এই গুণী মানুষের জন্মবার্ষিকী এবং মৃত্যুবার্ষিকী নিরবেই চলে যায়, রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক ভাবে কোন বিশেষ আনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় না এটা তার ভক্ত ও শোভাকাঙ্খিদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। যেটা কবির ভক্তদের জন্য অত্যান্ত লজ্জা আর অসম্মানের। এটা একুশে পদক প্রাপ্ত কবির প্রতি চরম অসম্মানরও বটে ।

কবি আজিজুর রহমানের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য বছর কয়েক আগে কবির বাস্তুভিটায় সরকারি উদ্যোগে অডিটোরিয়াম, জাদুঘর ও লাইব্রেরি নির্মানের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু মাজারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ছাড়া আর কোনো কাজ আজ অবধি করা হয়নি। স্থানীয় জনগণ ও কবির ভক্তরা মনে করেন, সরকারের গ্রহণকৃত প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা গেলে নতুন প্রজন্মের কাছে কবির জীবনকর্ম ও সঠিক ইতিহাস সহজেই পৌঁছে দেওয়ার যাবে ও কবিকে নিয়ে দেশ বিদেশের মানুষ গবেষণা করার সুযোগ পাবে এবং কবি আজিজুর রহমানকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলা যাবে।

এই গুণী গীতিকার, সাহিত্যিক ও কবি আজিজুর রহমান গ্যাংগ্রিন রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকার পিজি হাসপাতালে ৬৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির শেষ ইচ্ছানুযায়ী তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুর গ্রামে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি ৪ কন্যা রওশন আরা বুড়ি, হোসনে আরা টুকু, আক্তার আরা বেবী, নাজমা রহমান বেলী ও ৩ ছেলে ফজলুর রহমান মনি, মুহাম্মদ শামছুর রহমান শামু ও সহিদুর রহমান বাচ্চুকে রেখে যান।

কবির স্মৃতির প্রতি অবহেলা ও সংরক্ষাণের অভাবে তার লেখা জনপ্রিয় গানগুলো আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই কবির লেখা গানগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য এবং প্রতি বছর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সরকারিভাবে কবি গীতিকার আজিজুর রহমানের জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই এলাকাবাসী জোর দাবী জানিয়ে আসছেন।

এ এইচ


oranjee