ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৯ | ১১ মাঘ ১৪২৫

 
 
 
 

গ্লোবাল টিভি অ্যাপস

বিষয় :

ঢাকা

‘ক্লাসিকটা জানলে আধুনিক গানও গাওয়া যায়, পল্লিগীতিও গাওয়া যায়’

অনুরূপ আইচ ও সৈয়দ নূর-ই-আলম ২:৩৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৬, ২০১৯

ডঃ তপন বাগচী

ডঃ তপন বাগচী। বাংলাদেশের একজন সাহিত্যিক, গবেষক। এদেশের সাহিত্যের সূতিকাগার বাংলা একাডেমিতে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। গান, কবিতা, গল্প, গবেষণা লেখা এবং চাকরি সবমিলিয়ে সময়টা এখন ভীষণ ব্যস্ত তার।তিনি কথা বলেছেন গ্লোবাল টিভি অনলাইনের সাথে। একান্ত সে আলাপে বলেছেন নিজের সম্পর্কে। বলেছেন সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। আলাপচারিতার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-

গ্লোবাল টিভি অনলাইন: দেশে এতোসব পেশা থাকতে লেখালিখিতে এলেন কেন? এই প্রেম কি অনেক বড় হয়ে এসেছে জীবনে, নাকি শৈশব থেকেই অটুট রয়েছে?
ডঃ তপন বাগচী: লেখা আমার পেশা নয়, আগেই বলে রাখি। তবে আমার পেশার ভেতরে লেখার ব্যাপারটা আছে। পড়ালেখা করেছি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। লেখার ব্যাপারটা সেখানে আছে। পিএইচডি করেছি বাংলা বিভাগে। সাহিত্যর ব্যাপারটি সেখানে আছে। আর পেশা শুরু করেছি সাংবাদিকতার মাধ্যমে। পরে এনজিওতে প্রকাশনা ও গবেষণায় যুক্ত থেকেছি। আবার সরকারি চাকরিতে এসেছি। সেখানেও সম্পাদনা ও গবেষণা। ফাঁকে তো লেখার প্রেম লালন করতেই হয়। শৈশব থেকেই লেখা। আমার বাবা তুষ্টচরণ বাগচী কবিতা ও গান লিখেছেন। সম্প্রতি খুঁজে পেয়েছি তাঁর লেখা ৯ টি পান্ডুলিপি। ৭ টিই গানের। তার মানে লেখাটা আমার রক্তেই ছিল, জানতে পেরেছি। বাবার প্রেরণাতেই লিখতে আসা। স্কুলের পড়া দ্রুত শেষ হয়ে যেতো। বাকি সময়টা খেলাধুলা করতাম। কিন্তু আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখতে পারতেন না, লিখতে বলতেন। বাবাকে খুশি করতেই কবিতা লিখতাম। তাঁর প্রশংসা ও প্রশ্রয়েই আমার লিখতে আসা। এখন তো না লিখে আর উপায় নেই। লেখাই আমার ললাটলিখন। আমৃত্যু অটুট থাকুক এই প্রেম।

গ্লোবাল টিভি অনলাইন: কবিতা, ছড়া, গদ্য, গান- সাহিত্যের কোন শাখায় আপনার বেশি টান?
ডঃ তপন বাগচী: শুরু হয়েছে কবিতালেখার মাধ্যমে। কবিতাই আমার প্রথম অবুঝ প্রেম। এরপর বুঝেশুনে এসেছি ছড়া লিখতে। রাজনৈতিক ছড়া, স্বৈরাচার তাড়ানো ছড়া। গদ্য লিখেছি চাকরির তাগিদে। আর সব কথা তো কবিতা-ছড়ায় বলা যায় না। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে গেলে তো গদ্যই প্রাণবান্ধব। গান লিখতে এসেছি ভাটির বেলায়। তবে মাধ্যম বা প্রকরণ আমার লেখার অন্তরায় হয়নি। ক্লাসিকটা জানলে আধুনিক গানও গাওয়া যায়, পল্লিগীতিও গাওয়া যায়। আমি সেই লেখার ক্লাসিকটা শিখতে চেয়েছি মাত্র।

গ্লোবাল টিভি অনলাইন: দেশে এখন গান না জানা শিল্পী বা গ্রামার না জানা গীতিকার-সুরকারের দৌরাত্ম্য চলছে বলা যায়। তাদের অনেকেই এখন খ্যাতির শিখরেও রয়েছে- ব্যাপারটা বাংলাদেশের গানের জন্যে কতটা মঙ্গলময় হচ্ছে?
ডঃ তপন বাগচী: লিখতে লিখতেই লেখক। কাজ করতে করতেই জানা হয়ে যায়। তবে গীতিকার তো গানের কবিতা লেখেন। তাকে কবিতার শৈলী জানতে হয়। ছন্দ ছাড়াও কবিতা লেখা যায়। কিন্তু গানের কবিতা লিখতে ছন্দটা জানতে হয় নিখুঁতভাবে। ছন্দপতন হলে তালে মার খাবে। দক্ষ সুরকার হয়তো মাত্রাপতন ঠেকিয়ে দেন তাল বিলম্বিত কিংবা প্রলম্বিত করে। সেই কৃতিত্ব তো সুরকারের। ভুল ছন্দের গানও জনপ্রিয় হয়েছে বলে ভুল গান লেখার প্রবণতাকে মেনে নেয়া যায় না। জনপ্রিয়তার ওই কৃতিত্ব সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীর। আর অন্ত্যানুপ্রাসের ভুল তো সাধারণ শ্রোতার কানেই ধরা পড়ে। তবু ভুল ছন্দ, ভুল অন্ত্যানুপ্রাস, ভুল পর্ববিন্যাসের গানের দৌরাত্ম্য চলছে। গীতিকার এখন নিজের খরচে গানে সুর করালে বা শিল্পীদের সম্মানী দিয়ে গাওয়ালে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে তা ঠেকানোর সাধ্য কারো নেই। আপনি এখনকার সময়ের কথা বলছেন কেন? ষাটের দশকের চলচ্চিত্রের গানের জনপ্রিয় গীতিকার সৈয়দ শামসুল হকের কথাই ধরুন। কবি হিসেবে তিনি যথেষ্ট খ্যাতিমান। তাঁর গানের বাণীর দুর্বলতা নিয়েও আমি প্রবন্ধ লিখেছি। খান আাতাউর রহমান, আমজাদ হোসেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গানের কবিতা থেকেও আমি ভুল অন্ত্যমিল, ভুল ছন্দ খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু খোন্দকার নূরুল আলম, সত্য সাহা, সুবল দাস, বশীর আহমদের মতো সুরকারের কৃতিত্ব ওইসব দুর্বলতা শ্রোতার কানে পৌঁছাতে পারেনি। আজকে যখন লিখিত টেক্সট নিয়ে বসি, তখন তো তা চোখে পড়ে যায়। গানের কবিতার বিচার হবে কাব্যতত্ত্ব দিয়ে। সুর শুনে মুগ্ধ হলেই তা কবিতার উৎকর্ষ ঘোষণা করে না। আজকাল যারা গান লিখছেন, তাদের বেশিরভাগই দেখছি গীতিকবিতার রীতিপদ্ধতি মান্য করেন না। কণ্ঠশিল্পীর তাল কেটে গেলে আমরা যদি আঁতকে উঠি, তবে ছন্দচ্যুতিকে কেন অনুমোদন করবো। জীবিত গীতিকারদের মধ্যে মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, অসীম সাহা, আবিদ আনোয়ার, নাসির আহমেদ, সুমন সরদার, জ্যোতির্ময় সেন যদি শুদ্ধ ছন্দমিলে গানের কবিতা লিখতে পারেন, অন্যরা তবে পারবেন না কেন। এই যে আইয়ুব বাচ্চু অকালে চলে গেলেন, অনেক বড় শিল্পী তিনি। তার গানের কবিতাগুলো পড়ে দেখুন তো! কাব্যতত্ত্বের বিচারে শুদ্ধ কবিতা কয়টি? কিন্তু সুর ও পরিবেশনার গুণে তিনি দামী শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। চলচ্চিত্রের গানে সিচুয়েশন মেনে লিখতে হয় বলে শব্দের সঙ্গে কিছুটা আপোষ হয়তো করতে হয়! কিন্তু ছন্দ ও মিলের ঘাটতি থাকবে কেন? শামসুর রাহমান, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান তো চলচ্চিত্রের জন্য গানের শুদ্ধ কবিতা লিখে গেছেন। তাঁরা পারলে আমরা পারছি না কেন? পারছি না আমাদের যথাযথ শিক্ষার অভাবে। পারছি না সঙ্গীতের প্রতি প্রকৃত প্রেমের অভাবে। এই অভাব আমাদের গানের জগতকে অমঙ্গলের পথে নিয়ে যাচ্ছে। সুর যতই ভালো হোক, গায়কী যতই ভালো হোক, মূল ভিত্তি তো সেই কবিতা। ২ তলার ভিত্তি গেঁথে ১০ তলা বাড়ি বানালে তো ধসে পড়বেই। গানের কবিতা প্রথমেই যায় সুরকারের হাতে। তিনি যদি কবিতা নির্বাচনে আপোষ না করার যোগ্যতা রাখেন, তবে দুর্বল গীতিকার নিজেকে শুধরে নিতে সাধনা করবে। তাতেই গানের মঙ্গলযাত্রা শুরু হতে পারবে পুনরায়।

গ্লোবাল টিভি অনলাইন: কেউ গান লেখার সঠিক নিয়ম না জানলেও যদি ভেতরে গান লেখার তাড়না অনুভব করে, তবে কি সে গান লিখবে না?
ডঃ তপন বাগচী: ভেতরের তাড়না থেকেই গান লিখবে। তাড়না থেকে শিশু হাঁটতে চায়। কিন্তু শেখার আগে তো পড়ে যাবে, আবার উঠে দাঁড়াবে, বড়দের আঙুল ধরে হাঁটবে, একসময় সে দৌড়াবে। কিন্তু হাঁটতে শেখার আগে দৌড়াতে গেলে তো মুখ থুবড়ে পড়বে। সঠিক নিয়ম না জেনে লেখে বলেই তো গানের দুর্দশা কাটছে না। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া কোনো কোনো গানের দুর্বলতাও আমি দেখাতে পারি। ভালো গানের অভাব বলেই হয়তো দুর্বল গান স্বীকৃতি পাচ্ছে। কিংবা ভাল গান যারা লেখেন, তাদের ডাক পড়ে না বলেই আমরা অশুদ্ধ বাণী নিয়েই আছি। শুনুন, যিনি গান লেখেন, তিনি যদি শিখতে চান, তবে তিনদিনের বেশি সময় ব্যয় করতে হয় না। গানের কবিতা লেখার নিয়মকানুন আছে এবং তা যে মান্য করতে হয়, সেই প্রয়োজন তো তাঁকে অনুভব করতে হয় না। স্পন্সর যোগাড় করতে পারলে বড় সুরকার সুর করবেন, বড় শিল্পী গাইবেন, বড় চ্যানেলে প্রচার হবে। গীতিকার হতে আর বাঁধা কী!! গানের কবিতায় যে ভুল আছে, তা ধরিয়ে দেবে কে? কিংবা ধরিয়ে দিলেই যে তা মানতে হবে, এমন দিব্যি কে দিয়েছে?? তাই ভুল গানের গতি অপ্রতিরোধ্য!!

গ্লোবাল টিভি অনলাইন: গান লেখা নিয়ে আপনার জীবনে অনেক মজার ঘটনা আছে জানি, সে সম্পর্কে বলুন।
ডঃ তপন বাগচী: মজার ঘটনা? শুনুন, সচেতনভাবে গান লেখার আগেই আমি গান লিখেছি। তখন জানতাম না ওটা গান। লিখতাম ছড়া। মনে হতো একটা অনুচ্ছেদ শেষে যদি প্রথম চরণে ফিরে যাওয়া যেতে, তবে নতুন একটি রিদম তৈরি হতো। সেই ভেবে প্রত্যেক অনুচ্ছেদের পরে আবার প্রথম চরণের মতো মিল। কে জানতো যে ওকেই ব্রিজলাইন বলে? কে জানতো যে ওই অনুচ্ছেদই অন্তরা! পরে যখন গানের কাঠামো লক্ষ্য করে গান লিখতে চেয়েছি, তখন দেখলাম যে এধরনের কাঠামার ছড়া আমি লিখেছি তো! তার মানের বোঝার আগেই গান লেখা আমার হয়েছে। ভেবে বেশ মজা লাগল। একবার কবি আবিদ আনোয়ার ও শিল্পী বিশ্বজিৎ রায় উদ্যোগ নিলেন শিল্পী অনুপ ভট্টাচার্যের ৬০তম জন্মদিন উদযাপন করবেন। আামকে লেখা দিতে হবে সুভ্যেনিরের জন্য। কিন্তু গান নিয়ে লেখা কি চাট্টিখানি কথা। তো আমি করলাম কী; যেহেতু তিনি শিল্পী, তাকে নিয়ে একটা গান লিখে ফেললাম। পাতা ভরানোর কৌশল আর কী! ছড়া লিখেছি মুসা ইব্রাহিমকে নিয়ে। ফকির আলমগীর কল করে অনুমতি চাইলেন ওটা টেলিভিশনে গাওয়ার জন্য। আমি তখন প্রথম আলোতে কাজ করি। বললাম, ওটা তো ছড়া। ব্রিজ লাইন নাই। তিনি বললেন সমস্যা নেই। ওতেই চলবে। গাইলেন তিনি। প্রশংসাও পেলেন। আমার নাম অনেকে জানলেন গীতিকার হিসেবে। অথচ ওটা গান-ই নয়। এরপর ফকির আলমগীর বললেন মালালাকে নিয়ে গান লিখে দিতে। এই প্রথম আমি সচেতনভাবে গান লিখি এবং গানটি তিনি প্রতিটি টিভি চ্যানেলে এবং মঞ্চে পরিবেশন করেন। এরপর গান লেখার গতি বাড়লো। কেউ ছড়া চাইলেও গান দিই, কবিতা চাইলেও গান দিই। কবিতা-ছড়া-গান তো আলাদা কেবল আঙ্গিকে, ভাব-ভাষায় তো অবিচ্ছেদ্য। সমকালের সারাবেলা পৃষ্ঠার জন্য কবি অদ্বৈত মারুত যখন একঘন্টার মধ্যে ছড়া পাঠাতে বলে, আমি তো মোবাইলের বাটন টিপেই লিখে ফেলি ছড়াগান। ‘শব্দঘর’ পত্রিকার সম্পাদক-সাহিত্যিক মোহিত কামাল যখন গুচ্ছকবিতা দিতে বলেন, আমি তো পাঠিয়ে দিই গীতিকবিতা। আর এসবই লেখা আমার মোবাইল ফোনে। ফকির আলমগীরকে তো চেনেনই। যখন চান, তখনই দিতে হবে। ‘তপন চ্যানেল-আইতে যাচ্ছি, ভূপেন হাজারিকা মারা গেছেন, তাকে নিয়ে বলবো। ফাঁকে গান গাইবো। এখুনি গান দাও ভূপেন হাজারিকাকে নিয়ে।’ আমি হয়তো রিকশায় ঘরে ফিরছি, কে শুনে কার কথা? লিখতে হলো গান। সঞ্জয় রায় গান রেকর্ড করতে বসছেন। এমন সময় মনে পড়রো বঙ্গমাতাকে নিয়ে একটা গান হলো ভালো হয়। কী আর করা! ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো। বন্ধুকে ধরো। লিখে দিতে হলো গান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র নিয়ে সেমিনারে আছি। ফোন দিলেন শিল্পী অণিমা মুক্তি গমেজ--‘দাদা, নারায়ণগঞ্জ লোকশিল্প জাদুঘরে যাচ্ছি পৌষমেলায় গান গাইতে হবে। একটা গান লিখে দেবেন?” কী আর করা সেমিনারের সভাপতিত্বের চেয়ারে বসেই লিখে ফেলি গান। বিন্দুমাত্র প্রস্তুতি ছাড়া এরকম তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে গান লিখেছি প্রায় ৪ শত। আর তা প্রায় সবই মোবাইল ফোনে। একবার শখ হলো ভালো কোনো সুরকারকে দেখাই গানগুলো। আমার বন্ধু উত্তম ঘোষ নিয়ে গেলেন এক সুরকারের কাছে। প্রচুর ব্যস্ত তিনি। ১০টি গান দিয়ে এলাম। এক সপ্তাহ পরে যোগাযোগ করতে বললেন। কল করলাম। বাসাতে যেতে বলেন। ইনবক্সে নক করলেও বাসায় যেতে গেলেন। খুব সমাদর করলেন। তারপর সবাইকে বিদায় দিয়ে একান্তে বসলেন আমার গান নিয়ে। বললেন, ‘অসাধারণ বাণী আপনার। কিন্তু ছন্দে তো ঠিক নেই। তা নিয়ে ভাববেন না। আমি ঠিক করে নেব।’ আমার চোখে তো কপালে উঠে গেলো প্রায়। কারণ আমি ১০০% ভাগ নিশ্চিত যে আমার গানে ছন্দ কিংবা অন্ত্যমিলে একবিন্দু ভুল নেই। বললাম, ‘ভাই, একটা যদি পড়ে দেখাতেন যে ছন্দে কোথায় ভুল!’ তিনি পড়লেন আমার ২টি গান। তার পাঠ শুনলে যে কেউ মনে করবে যে সত্যিই ভুল আছে। পর্ববিন্যাস তো বুঝতে হবে। পর্বযতি না মেনে পড়লেও মাত্রাপতন মনে হবেই। এবার আমি গানদুটো নিয়ে পড়লাম। বললাম, ‘এবার কি তাল কাটে?’ শ্রদ্ধেয় সুরকার আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আরে তাই তো। এখন তো আর ভুল মনে হচ্ছে না। আচ্ছা। আপনি আরো গান দেবেন। আপনার সব গানে আমি নিজের উদ্যোগে সুর করব এবং বড় শিল্পীদের দিয়ে গাওয়াবো। ৩ বছর পেরিয়ে গেছে।একটি গানেও সুর বসেনি, হাহাহাহ। আরেকটা গানের কথা বলি। জাতীয় পর্যায়ে এক প্রতিযোগতিায় আমার গান পুরস্কৃত হয়েছে। মূল অনুষ্ঠানে হবে সেই গান। আয়োজকরা আমাকে সুরকারের সাথে যোগাযোগ করতে বললেন। আমি গেলাম সুরকারের বাড়ি। তিনি একটি গান গেয়ে শোনালেন। খুব সুন্দর লাগল। আমি তারিফ করলাম। সুরকার-শিল্পী বললেন, ‘এই জন্যই ডেকেছিলাম। গীতিকার হিসেবে আপনার একটা অভিমত নিয়ে নিলাম।’ বললাম, ‘আহা রে, গানটি সুন্দর, সুরটি আরো সুন্দর, কিন্তু একটি চরণও তো আমার নয়!’ তিনি বললেন, ‘সুরের সাথে মেলানোর জন্যে একটু শব্দবদল করেছি।’ বললাম, আপনার তো শব্দের সাথে সুর মেলানোর কথা। এখানে শব্দ তো ঠিক থাকবে। এই শব্দ লিখেই তো গানটি পুরস্কৃত। তাতে সুর হবে আপনার সুবিধামতো।’ এবারে তিনি বললেন, ‘আসলে দাদা, সময় কম ছিল তো, তাই মনের ভেতর বাজতে থাকা একটা সুরে শব্দগুলো ফেলে গানটি বানাতে চেয়েছি। কালকেই শো। এখন কী করি?’ আমি সুরকারে সমস্যা বুঝতে পারলাম। বললাম, ‘চিন্তা করবেন না। এই কফি খেতে খেতে এই সুরেই গান লিখে দিচ্ছি।’ ২০মিনিটের মধ্যে লিখে দিলাম। এবার তার চক্ষু কপালে উঠল। ‘আরে, এই অল্প সময় ঠিকঠিক লিখে দিলেন, আপনি?’ আমি হেসে বিদায় নিলাম। এরকম আরো মজার ঘটনা আছে। একবার পদ্মানদী পার হচ্ছি স্পিডবোটে। এমন সময় গান লেখার অফার। পারাপারে সময় লাগে ১৮ মিনিট। ঢেউয়ের দোলায় ভাসতে ভাসতে অই ১৮ মিনিটেই লিখে ফেলেছি গান। আমি আনন্দিত যে আমার কোনো গানে ছন্দ, পর্ববিন্যাস এবং অন্ত্যানুপ্রাসে ভুল করিনি। ভালো কোনো সুরকারের নজরে পড়লে আমার গান অনেকেরই পছন্দ হবে। আমি সেই সুদিনের অপেক্ষায় আছি।

গ্লোবাল টিভি অনলাইন: ফেব্রুয়ারির বইমেলায় আপনার নতুন বই কি কি পাবে পাঠকেরা?
ডঃ তপন বাগচী: আমার গানের কবিতার বই বেরিয়েছে আগে ৪ খানা। সেই ধারাবাহিকতায় এবার বেরুচ্ছে গানের বই ‘বঙ্গবন্ধু থেকে মালালা: মন্দ্রিত সুরধ্বনি’। এতে ৬৭টি গান আছে। সবই ব্যক্তিবন্দনাকেন্দ্রিক। বঙ্গবন্ধু, লালন, আবদুল হামিদ খাঁ ভাসানী, শেখ হাসিনা, মণি সিংহ, ভূপেন হাজারিকা, ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিন, তারামন বিবি, মহাশ্বেতা দেবী, ইলা মিত্র-- এরকম অজস্র চরিত্র রয়েছে আমার গানে। বইটি প্রকাশ করেছে আশালতা প্রকাশনী। এছাড়া একটি ছড়ার বই ‘মুজিব-নামে রক্তদামে’, গল্পের বই ‘রূপকথার নদী’ বেরুচ্ছে। আরো ৩/৪খানা বই বেরুতে পারে। কাজ চলছে।

গ্লোবাল টিভি অনলাইন: চাকুরি ও লেখালিখি- কোনটায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
ডঃ তপন বাগচী: চাকরি এবং লেখালেখি দুটোই ভিন্ন বিষয়। চাকরি তো জীবিকা। লেখালেখি জীবনের চালিকাশক্তি। আমার চাকরি বাংলা একাডেমিতে। লেখালেখির জগতেই আছি। চাকরি নিয়ে আমি পরিপূর্ণ তৃপ্ত। আর লেখা তো আমার রক্তের ভেতরেই। এটা মনের টান। চাকরি একসময় থাকবে না। অবসরে যেতে হবে। কিন্তু লেখকের কোনো অবসর নেই।

 

এএ/এসএনএ


oranjee