ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ১ আশ্বিন ১৪২৬

 
 
 
 

গ্লোবাল টিভি অ্যাপস

ঢাকা

মামুনুর রশীদের ‘কালের দর্পণ’ : আমার অনুভূতি

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:৫৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০১৯

ফাইল ছবি

আতিক হেলাল : আমি কবিও না, সমালোচকও না। তারপরও এমন বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় আমাকে। অনেকেই আমাকে ভালোবেসে, শ্রদ্ধা ও সম্মান করে তাঁদের লেখা কবিতা-গল্প ইত্যাদি এবং প্রকাশিত বই আমাকে উপহার দেন। এই পর্যন্ত হলে তো সমস্যা ছিলো না। লজ্জা পাই তখনই, যখন অনেকেই আমার মন্তব্য বা আলোচনা-সমালোচনা চান তাঁদের লেখা নিয়ে। বিশেষ করে, কবিতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তো আমি করতেই পারি না। কোনো কবিতা আমার সবিশেষ ভালো লাগলে কিংবা প্রিয় বা ঘনিষ্ঠ কারও লেখায় গুরুতর কোনো ভুল চোখে পড়লে স্বপ্রণোদিত হয়েই কখনো তা বলে ফেলি, এটুকুই।


কিন্তু বিপদ কমে না। ভালোবাসার বই উপহার বেশ ভালোই পাচ্ছি এবং পাচ্ছি সমালোচনা লেখার আব্দারও। এবং প্রায় সবাইকেই ‘না’ বলে দিই। কাউকেই কথা দিই না। তারপরও কেউ-কেউ বলেন, ‘যদি সময় পান কখনও, একটু পড়বেন এবং দু’লাইন হলেও লিখবেন।’ মানে, অপশনাল। বাধ্যতামূলক না। সেটাও কিন্তু কম কষ্টের না। লেখার কষ্ট না। না লেখার কষ্ট।

কিন্তু সম্প্রতি স্নেহভাজন কবি মামুনুর রশীদ একটি অনুষ্ঠানে আমাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরলেন সজোরে। ছাড়া পেয়ে ভাবলাম, শেষ। কিন্তু না। আমার হাতে তুলে দিলেন তার সাম্প্রতিক কবিতার বই ‘কালের দর্পণ’। এবং আমাকে কঠিনভাবে বললেন, ভাইয়া, ‘না’ করতে পারবনে না। আমার বইটা সম্পর্কে আপনাকে কিছু লিখতেই হবে। আপনার একটু সমালোচনা আমার অনেক অনুপ্রেরণা।’ আমি বললাম, তাই নাকি? তাহলে বইটা পরে নিই। সময় পেলে আমিই চেয়ে নেবো এবং লেখার চেষ্টা করবো।


না, কাজ হলো না। নিতেই হলো এবং অস্ফুট স্বরে হলেও কথা দিতেই হলো। বললাম, আচ্ছা চেষ্টা করবো। তবে আলোচনা-সমালোচনা তো আমি করতে পারি না। আমি আমার অনুভূতি প্রকাশের চেষ্টা করবো।


কিন্তু মামুন আমার কাছ থেকে এমন ‘অস্পষ্টভাবে’ কথা আদায় করলেও আমি কিন্তু শান্তি পাচ্ছিলাম না। বইটি অফিসের টেবিলে চোখের সামনে এনে রেখেছিলাম সেদিন থেকেই। অনেকের বইই এভাবে এনে রাখি সামনে, যদি কিছু লিখতে পারি, সেই আশায়। যেহেতু দিনের সিংহভাগ সময় আমার কর্মস্থলেই কাটাতে হয়, টেবিলে রাখা বইগুলো আমাকে বিশেষভাবে তাড়া দেয় প্রতিদিনই।
মামুনের বইটি তাড়া দিচ্ছে একটু বেশিই ইদানিং।


আলোচনা-সমালোচনা পরের কথা, কেমন লাগলো, সেই অনুভূতি  প্রকাশ করতে হলেও তো বইটা মানে বইয়ের লেখাগুলো সব পড়তে হবে। শুধু তাই না, মন দিয়ে, সময় দিয়ে পড়তে হবে। সেই সময় কি আমার মতো চাকরিজীবীর আছে? সুতরাং, বুঝতে হবে, অনুভূতি কেমন হতে পারে।


৪ ফর্মা বা ৬৪ পৃষ্ঠার ‘কালের দর্পণ’-এ কবিতা আছে ৪৮টি। ২০১৯-এর একুশে গ্রন্থমেলায় বইটি প্রকাশিত হয়েছে ‘বইমেলা’ থেকে। অর্থাৎ প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠানের নামও ‘বইমেলা’। এটি তাঁর ২য় কবিতার বই ‘প্রেম রোমাঞ্চের শব্দনদী’ কবে প্রকাশিত, উল্লেখ নাই। ২য় বইটি উৎসর্গ করেছেন (তাঁর জবানিতে) : যার অনুপ্রেরণায় আমি লিখে যাই, প্রাণপ্রিয় সহধর্মিনী ফারজানা রহমান ঝর্নাকে।

লেখকের পরিচিতিতে লেখা আছে : ...তিনি একাধারে একজন কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকার, প্রকাশক, সাহিত্য-সমালোচক ও সাহিত্য-সংগঠক।
অর্থাৎ তিনি নিজেই একজন সাহিত্য-সমালোচক। তাই তাঁর কবিতার সমালোচনা করা অন্তত আমার পক্ষে অধিকতর কঠিন কাজ।

‘কালের দর্পণ’-এর প্রথম কবিতা (চতুষ্পদী) ‘কালের দর্পণ’-এ আকৃষ্ট হই :
নিজ আলো নেই তবু কত রূপ অঙ্গে
পর আলো মেখে গায়ে ভূলোকে বিলায়ে
সুসোভিত করে সব মোহনীয় রঙ্গে
নয়ন শীতল করে জোসনার নায়ে।...

এরপর দীর্ঘ ‘কবিতার চাষ’-এও থমকে যাই:
শব্দের বেড়াজালে হাঁপানো কবি-
একটু দাঁড়াও!
শব্দের খোঁজে হৃদয় জমিন তোমার চৌচির খরাক্রান্ত!
কবিতার একটি টগবগে শরীর চাই কি?

কিংবা-
‘শোনো মহামায়ার তান্ত্রিকেরা
তোমাদের বশীকরণ মন্ত্র এখন বিকল ষড়যন্ত্র,
বিলুপ্ত সভ্যতার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনি এখন নিয়ত।
(শব্দদের মুক্তি চাই)

কবি আল মাহমুদকে নিবেদিত ‘কবি’:
কবি তো ঐ সবুজ বন
পাহাড় চূড়োর স্বপ্ন,
ঘোর তমসায় জোনাকীর আলোয় দেখা পথ...
কবি তো হৃদয়ে গ্রোথিত সোনালী শৈশব।..

আল মাহমুদের লেখা কালজয়ী ‘কবিতা এমন’কে মনে করিয়ে দেয়:
...কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।

গ্রন্থভুক্ত মামুনের আরও কিছু কবিতা সময়কে ধারণ করে, যা প্রশংসার্হ। যেমন-
আজ হারিয়ে বিবেক
ধরে সব সাধু ভেক
(সত্যকে সে চাপা দিয়ে মারে
রাজার বাড়ির ছাদে
লালসারা বাসা বাঁধে
বিচার দেবো রে আজ কারে?
সময়ের আহাজারি)

তবে, অন্ত্যমিল দিতে গেলে অধিকতর সতর্কতা প্রয়োজন। যেমন-
স্বাধীনতা! আমায় তুমি কি (কী) দিয়েছো বলো!
আজও কেন রক্ত নিয়ে ছিনিমিনি খেলো? (মুক্তির যাতনা)

‘বলো’র সাথে ‘খেলো’ দুর্বলতা প্রকাশ্য।

অন্য কথা: মামুনুর রশীদ নামে দেশে একজন স্বনামধন্য নাট্যকার, লেখক রয়েছেন। হুবহু একই বানানে। সেই বিচেনায় কবিতার বইয়ের নাম ‘কালের দর্পণ’কেও মামুনুর রশীদের নাটক বলে বিভ্রম সৃষ্টির সুযোগ দৃশ্যমান। কবি মামুনুর রশীদও তাঁর লেখকনামটি পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। এটি আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ।

কালের দর্পণ
লেখক: মামুনুর রশীদ
প্রকাশক : বইমেলা, ১৯২ ফকিরাপুল, ঢাকা।
ফোন: ০১৮৩৭৬৭৭৭৭৭
প্রচ্ছদ : মামুনুর রশীদ
দাম : ২২০ টাকা (৬৪ পৃষ্ঠা)।


oranjee