ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

অযত্ন-অবহেলায় জীবনানন্দ দাশের স্মৃতিবিজড়িত ‘দাশের ভিটা’

গ্লোবালটিভিবিডি ৪:৪৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৯

এক সময়ের আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ধানসিঁড়ি নদী এখন পরিণত হয়েছে মরা খালে

ঝালকাঠি প্রতিনিধি: ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বামনকাঠি গ্রাম। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ধানসিঁড়ি নদী। নদীতীরের গ্রামটিতে একটি পরিত্যক্ত ভিটায় রয়েছে কিছু গাছপালা। পুকুর থাকলেও ঘাট ভাঙাচোরা। স্থানীয়ভাবে এটি ‘দাশের ভিটা’ নামে পরিচিত। এটাই বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃৎ ও রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের পৈতৃক ভিটা।

জীবনানন্দ দাশের শৈশব-কৈশোর এমনকি যৌবনের অনেক সময় পার হয়েছে বামনকাঠি গ্রামে। তার পৈতৃক ভিটা দেখতে আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটক। তবে এই বিরান ভিটা দেখে হতাশ হওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকে না।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভিটির ধ্বংসপ্রাপ্ত চিহ্ন কোনোমতে আছে। কিছু গাছপালা এবং একটি ঘাট বাঁধানো পুকুর ছাড়া অবশিষ্ট আর কিছুই নেই।

বামনকাঠি এলাকার রমজান আলী (৭৩) বলেন, ৩০ বছর আগেও দাশের বাড়িতে অধি দাশ ও ভোলা দাশ নামে কবির দুই জ্ঞাতি স্বপরিবার বসবাস করতেন। তখন একটি ডাকাতির ঘটনায় দুই ডাকাত গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার পর তারা পুলিশি হয়রানির ভয়ে ঘরবাড়ি বিক্রি করে ভারতে চলে যান। এরপর থেকে ছাড়া ভিটায় পরিণত হয়েছে কবির জন্মস্থান।

এলাকার আরেক প্রবীণ আলী শিকদার বলেন, ‘ঢাকা ও কলকাতা থেকে বহু লোক কবির বাড়ি দেখতে আসেন। কিন্তু তারা শুধু জঙ্গল দেখে ফিরে যান। আমরা বিব্রত হই।’ একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করে এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

জীবনানন্দ দাশের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে এক যুগের বেশি সময় ধরে গবেষণা করছেন রাজাপুর ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. সোহরাব হোসেন। তার দাবি, কবির ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতায় উল্লেখ করা তিনটি নদী ধানসিঁড়ি, রূপসিয়া ও জাঙ্গালিয়ার অবস্থান কবির জন্মভিটার কাছেই। বেশ কয়েক বছর ধরে ঘেঁটে জানতে পেরেছি, কবির পূর্বপুরুষদের নিবাস ছিল ফরিদপুরে। কিন্তু সেখানে নদীভাঙনের শিকার হয়ে কবির বাবা ও দুই চাচা ঝালকাঠির বামনকাঠি গ্রামের সেন বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং এখানেই কবির জন্ম হয়। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ধানসিঁড়ি নদীর রূপ-লাবণ্যের কথা উঠে এসেছে। ধানসিঁড়ি নদী পরিচিতি পায় দেশ-বিদেশে। কিন্তু কবির স্মৃতিবিজড়িত সেই নদী এখন মরাখাল। একসময়ের খরস্রোতা ধানসিঁড়ি নাব্যতা হারিয়ে ও দুপাশ দখলে সংকুচিত হয়ে গেছে। ধানসিঁড়ি নদীটি রাজাপুরের বাগড়ি বাজার থেকে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে গিয়ে মিশেছে। এ ছাড়া জীবনানন্দ দাশের বাড়ির উত্তর দিক দিয়ে আরেকটি নদী প্রবাহিত ছিল। এই নদীর নাম রূপসিয়া। রাজাপুর বাজার থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দৈঘ্যের যে নদীটি বিষখালী নদীতে মিশেছে, সেটির নাম জাঙ্গালিয়া। এই তিনটি নদীই এখন প্রায় মৃত। তিন দশক আগেও আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ধানসিঁড়ি নদী ছিল রাজাপুরের সঙ্গে ঝালকাঠির নৌপথে যাতায়াতের একমাত্র সংযোগ সূত্র। এ নদী ধরেই রাজাপুরের লোকজন তখন ঝালকাঠি ও বরিশালে যাতায়াত করতো। এককালে দারুণ এ ধানসিঁড়ি নদীর দু’পাশ দিয়ে ক্রমাগত চর পরে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। জীবনানন্দ দাশ ধানসিঁড়ি নদীটিকে তার কাব্য ও সাহিত্যে যেভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাতে এখনও দেশ-বিদেশের অনেকেই আগ্রহ ভরে একনজর এই নদীটিকে দেখার জন্য ছুটে এসে আশাহত হয়।

সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ধানসিঁড়ি নদীর উৎস মুখ থেকে সাড়ে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে খননের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ওই সময় সাড়ে চার কিলোমিটার পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজাপুর অংশের পিংড়ি-বাগড়ি-বাঁশতলার মোহনা পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল। নিয়মিত বরাদ্দ না দেওয়ায় পরের সাড়ে তিন কিলোমিটার আর খনন করা হয়নি। প্রায় আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ধানসিড়ি নদীর রাজাপুর অংশের অবস্থা বড়ই করুণ।

ধাঁনসিড়ি নদীর রাজাপুর অংশে খননের অভাবে ও বাগড়ি বাজার গরুর হাট এলাকায় দখল হওয়ার কারণে নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। সর্বত্র কচুরিপানা আটকে আছে। ধানসিঁড়ির দুই পারে কয়েক‘শ হেক্টর উবর জমি আছে। কিন্তু নদীটি মরে যাওয়ায় সেচের অভাবে তা এক ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। এসব জমিতে বর্ষা মৌসুমে আমন ধানের আবাদ করতে পারলেও শীত মৌসুমে পানি না থাকায় বোরোসহ শীতকালীন কোনো ফসলের আবাদ করতে পারছেন না কৃষকেরা।

জীবনানন্দকে নিয়ে যথাযথ চর্চা ও প্রচার না থাকায় এই এলাকার অনেক মানুষের কাছেই তিনি রয়ে গেছেন বিবর্ণ স্মৃতি হিসাবে।

১৯৫৪'র ২২ অক্টোবর মৃত্যুর কিছু পূর্বে কলকাতার নাভানা প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করেছিল জীবনানন্দ দাশের 'শ্রেষ্ঠ কবিতা'। যে ধানসিঁড়ি নদীর রূপ-সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা লিখে কবি জীবনানন্দ দাশ বিশ্বব্যাপী খ্যাতিমান হয়ে ছিলেন, যে ধানসিঁড়ি নদীকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করে ছিলেন, সেই ধানসিঁড়ি নদী আজ কবির ন্যায় মৃত।
শুধু তাই নয়, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের আজীবন স্মৃতি বিজড়িত ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বামনকাঠি গ্রামের নিজ জন্মভূমি, পৈত্রিক বাড়ি আজ অবহেলা-অযন্তে বিস্তর্ণ ধানক্ষেতে পরিণত হয়েছে। তার অতি প্রিয় স্মৃতি বিজড়িত বিখ্যাত ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতার ধানসিঁড়ি নদীটি আজ ভরাট হয়ে ধু-ধু মাঠে পরিণত হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজা বেগম পারুল বলেন, রূপসী বাংলার কবিকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে উদ্যোগ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। পুনরায় ধানসিঁড়ি নদী খননে ও কবি জীবনান্দন দাসের স্মৃতি সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের সার্বিক সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হক জানান, রূপসী বাংলার কবিকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তার পৈতৃক ভিটা সংরক্ষণের জন্য সরেজমিন পরিদর্শন করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।

১৮৯৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ঝালকাঠি জেলার ধানসিঁড়ি নদী বিধৌত বামনকাঠি গ্রামের দাশ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জীবনানন্দ দাস। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর মাত্র ৫৫ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন তিনি।

 

 আর কে/এমএস


oranjee