ঢাকা, সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

গানকে ভালবাসি বলেই সব কষ্ট ভুলে যাই: লিটন অধিকারী রিন্টু

অনুরূপ আইচ ৬:৩০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০১৯

ফাইল ছবি

জনপ্রিয় গীতিকার লিটন অধিকারী রিন্টু । অনেক কালজয়ী গানের রচয়িতা তিনি। গান লেখা শুরু করেন আশির দশকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জনপ্রিয় টিভি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি’র কল্যাণে তার লেখা জনপ্রিয় সব গান পৌঁছে গেছে দেশের আনাচে কানাচে। আধুনিক গানের প্রতি রয়েছে তার ভালবাসা। সম্প্রতি সঙ্গীতাঙ্গনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি গ্লোবাল টিভি অনলাইনের সাথে।

দেশে এত সব পেশা থাকতে লেখালিখিতে এলেন কেন? এই প্রেম কি অনেক বড় হয়ে এসেছে জীবনে, নাকি শৈশব থেকেই অটুট রয়েছে?
রিন্টু: গান লেখা কিন্তু আমার নেশাও না, পেশাও না। কাজের ফাঁকে একটু আধটু লিখি। বন্ধু প্রয়াত বিশিষ্ট গায়ক শেখ ইসতিয়াকের চাপাচাপিতে আশির দশকের শুরুতে গান লেখা শুরু এবং তা ছিলো শুধুমাত্র বন্ধু ইসতিয়াকের জন্য। কোন ক্যাসেটে প্রকাশ হবে সেই চিন্তায় নয়। এভাবে তিন বছর ও আর আমি মিলে বেশকিছু গান লিখে ফেলি। ইসতিয়াক মিউজিশিয়ান ছিলো। স্টুডিওতে কাজের ফাঁকে গানগুলি গাইতো এবং ওর কাছ থেকে তৎকালীন বিভিন্ন শিল্পীরা গান নিয়ে গাওয়া শুরু করলো। মজার ব্যাপার হলো ইসতিয়াকের জন্য গান লিখলেও সে গান প্রথম কুমার বিশ্বজিতের কন্ঠে রেকর্ড হয় ১৯৮৩ সালে। আমার নেশা বলতে যা বুঝায় তা ছিলো ছবি আঁকা। পেশা বলতে মিউজিশিয়ান। ১৯৭৭ সালে বিটিভিতে গিটারবাদক হিসেবে ৫০ টাকা আয়ের মধ্য দিয়ে মিউজিসিয়ান লাইফ শুরু। যা বর্তমান প্রজন্ম জানে না। ১৯৮০ সালে গিটারের একাডেমী এবং ১৯৮৮ সালে অডিও-ভিডিও প্রডাকশন হাউস চালু করি। যেখান থেকে শিশুতোষ ম্যাগাজিনগুলো তৈরি এবং একটি আন্তর্জাতিক রেডিওর জন্য বাংলা অনুষ্ঠান তৈরির কাজ শুরু করি।

কবিতা, ছড়া, গদ্য, গান-সাহিত্যের কোন শাখায় আপনার বেশি টান?
রিন্টু: যেহেতু ছোট বেলা থেকেই আধুনিক গানের প্রতি ভালবাসা আর টান ছিল তাই গান লেখাতে একটু সাহস পাই। তবে বর্তমানে শিশুদের নিয়ে কাজ করার ফলে ওদের নিয়ে শিক্ষামূলক কিছু লিখতে ভালোই লাগে।

দেশে এখন গান না জানা শিল্পী বা গানের গ্রামার না জানা গীতিকার-সুরকারের দোরাত্ম্য চলছে বলা যায়। তাদের অনেকেই এখন খ্যাতির শিখরেও রয়েছে- ব্যাপারটা বাংলাদেশের গানের জন্যে কতটা মঙ্গলময় হচ্ছে?
রিন্টু: অনেকের জন্য অনেক বছর ধরে অনেক গান লিখলেও সঠিক সূত্রমতে সব গান আমি নিজেও লিখতে পারিনি। তাই এই বিচারটি আমি করতে পারবো না। যতই যা লিখি না কেনো কারো না কারো কাছে কিছু অপছন্দের বিষয় বা ভুল মনে হতে পারে। তবে এটা জানি, ভালো বিষয় বস্তু, কথা আর সুর ও মিউজিকের গভীর সম্পর্ক এবং সবশেষে একজন ভালো সুরেলা শিল্পী যদি সেই গানটি গায় তবে হিট না হলেও সে গান যুগের পর যুগ কারো না কারো কণ্ঠে বেঁচে থাকবে। আমাকেই বেছে নিতে হবে কোন গান করবো। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার গান বা সমাদর পাবে এমন কোন কিছু ? নাকি বয়ে চলা সময়কে শুধু জয় করার জন্য। এখানে আমি চলচ্চিত্রের গানকে টানবো না কারণ সেখানের হিসাব ভিন্ন।  প্রতিটি যুগেই নতুন কিছু এসেছে, আলোচনা সমালোচনা হয়েছে আগামীতেও হবে। মঙ্গল অমঙ্গল জনগণ বুঝে নেবে।


তবে কেউ গান লেখার সঠিক নিয়ম না জানলেও যদি ভেতরে গান লেখার তাড়না অনুভব করে, তবে কি সে গান লিখবে না?
রিন্টু: লিখবে না কেনো লিখতেই হবে, এতে সে সঠিক পন্থা খুঁজে পাবে। গ্রামের মেঠোপথে হেঁটে চলা কত অবহেলিত শিল্পী গীতিকবি আজ শহরে আমাদের প্রাণের প্রিয় মানুষ। তবে একটা কথা, একটি পরিকল্পিত ও নির্মাণ প্রক্রিয়া মেনে চলা গৃহ প্রথম দর্শনেই দৃষ্টি কেড়ে নেয়।


গান লেখা নিয়ে আপনার জীবনে অনেক মজার ঘটনা আছে জানি, সে সম্পর্কে বলুন।
রিন্টু: গান লেখা নিয়ে তেমন একটা মজার ঘটনা না থাকলেও দুঃখ কষ্টের ঘটনা আছে। আশির দশকের শুরুর দিকে- যখন বিটিভিতে সরাসরি গান রেকর্ড হতো গীতিকার সুরকার শিল্পী যন্ত্রী সব একসাথে বসে গান তৈরি এবং পরে ভিটিআর। এক প্রযোজক খবর দিলেন যেন কাল সকালে বিটিভিতে আসি এবং একটি গান লিখে দেই। শিল্পী এবং সুরকার দুজনেই স্বনামধন্য। লেখা সুর কম্পোজিশন এমনকি শিল্পীর গান তোলা সব কিছু যখন শেষ পর্যায়ে তখন একজন ব্যস্ত গীতিকার বয়সে আমার বড় তিনি হন্তদন্ত হয়ে এসে আমাকে বললেন, তুমি এই অনুষ্ঠানে গান লিখছো কি করে? কে তোমাকে সুযোগ দিলো? আমি নির্ধারিত গীতিকার এই অনুষ্ঠানের। তাছাড়া তুমি এনলিস্টেড গীতিকার নও, দেখি তো কী গান লিখেছো... একটু দেখে কাগজটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললো, ‘এটা কোন গান হলো’ -এই বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেলো, আমি সুরকার ও শিল্পী তিনজন তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কারণ তার তখন খুব দাপট ছিলো। একটু পরেই প্রযোজক এসে ক্ষমা চেয়ে বললেন, আমি দুঃখিত, উনি ডিজির কাছে কমপ্লেন করেছেন, আসলে ওনাকে আমি বাদ দিয়েছিলাম
সেই কারণেই এই ঘটনা। আর সেই অপমানই আমার জীবনের সম্মান। আর সেই মানুষটি এখন নানা অসম্মানের বোঝা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে
লেখার জগতে একেবারেই নিরুদ্দেশ।

১৯৮৫ সালে আমি বিয়ে করি বরিশালে। ১৯৮৬ সালে আমার স্ত্রী ঢাকায় আসেন স্থায়ীভাবে থাকার জন্য। আসার সময় ঢাকাতে বসবাসরত তার প্রিয় বান্ধবীর বাসার ঠিকানাটা নিয়ে এলো আর আমাকে অনুরোধ করলো একদিন সেই ঠিকানায় নিয়ে যেতে। যেহেতু নতুন বউ তাই দেরি করিনি। একদিন ছুটলাম সেই ঠিকানায় মগবাজার থেকে মিরপুর ১ নম্বর। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন বাড়িটি পেলাম দেখলাম দরজা বন্ধ তবে ঘরের ভিতরে ক্যাসেটে বেবী নাজনিনের গান বাজছে। অনেক নক করার পর একটি মেয়ের কন্ঠ- কাকে চাই। বললাম অমুক কি বাসায় আছেন? উত্তরে ‘নাই বেড়াতে গেছেন ফিরতে দেরি হবে।’ বললাম ‘একটু দরজাটা খুলবেন আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি একটা চিঠি লিখে যেতাম।’ ভিতরে ক্যাসেটে একটি গান বারবার বেজেই চলছে আর চিৎকার করে বললো দরজা খুলতে পারবো না, কারণ আপনাদের আমি চিনি না যা বলার বাইরে থেকেই বলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম ঘরের ভিতরে গান শুনছে কে? মেয়েটি বললো, ‘আমি শুনছি।’ তখন রাগ দুঃখ অপমান ভুলে বলে উঠলাম, এই গানকে ভালবাসি বলেই সব কষ্ট ভুলে গেলাম আর সাথে করে আনন্দ নিয়ে গেলাম কারণ যে গান তুমি শুনছো সে গান আমারি সৃষ্টি।

আরেকটা ঘটনা, গাবতলী থেকে সাভার যাব, বাসের ভিতরে ভিড়ে ঢুকতে না পেরে হেলপারের পিছনেই ঝুলছি। বাস যখন আমিন বাজার তখন হেলপার আমার লেখা কুমার বিশ্বজিতের একটি গান বাসের গায়ে তাল দিয়ে অবলীলায় গেয়ে চললো- প্রথমে আনন্দ পেলাম যে আমার লেখা গান গাইছে। এরপর হলো রাগ কারণ উল্টাপাল্টাভাবে গাইছে। শেষে পেলাম দুঃখ ও লজ্জা এই ভেবে যে, হেলপারকে বলতে পারছি না আর বললেও যদি বিশ্বাস না করে। আরো লজ্জা পেলাম এই ভেবে, গীতিকার হেলপারের পিছনে ঝুলছে।

ঢাকা শহরে ব্যস্ততার জন্যে অনেক লেখক মোবাইলের নোট প্যাডে কবিতা, ছড়া বা গান লিখে রাখেন। আপনার জীবনে এমন ঘটনা আছে কি?
রিন্টু: আমি জীবনে অনেক ডায়েরি উপহার পেয়েছি কিন্তু আজ-অবধি কোনো শিল্পী বা সুরকার আমাকে ডায়েরীতে গান লিখতে দেখেনি। তবে কাগজেই লিখতাম। এখনো লিখি হাতের কাছে যখন যা পাই তাতে।

 

এমএস


oranjee